বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৯ আশ্বিন ১৪২৭ ● ৫ সফল ১৪৪২
রাজনীতিতে আয় ও দলভারী করছে মালিকদের নমিনেশনে
জাকির সিকদার, ৭১ সংবাদ ডট কম :
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১০:১৯ এএম আপডেট: ১৭.০২.২০২০ ১১:৩১ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 133

রাজনীতিতে আয় ও দলভারী করছে মালিকদের নমিনেশনে

রাজনীতিতে আয় ও দলভারী করছে মালিকদের নমিনেশনে

একদিকে আয় অন্যদিকে দলভারী হয়ে জনীতিতে সুসময় বইছে  দেশের ব্যবসায়ী মালিকদের। এক সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অথবা সুসম্পর্ক রেখে চলা ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হয়েছেন। আবার কোনো দলীয় রাজনীতি না করেও কেউ কেউ পেয়েছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। 

এমনকি হয়েছেন ঢাকা সিটির মেয়রও। শুধু এমপি-মন্ত্রীই নন, দলীয় পদ-পদবিতেও আসছেন তারা। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই এখন পাইপ লাইনে আছেন বলে জানা গেছে। তবে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন আগে। যারা আওয়ামী লীগে সুবিধা করতে পারছেন না তারা এখন তলে তলে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে দলের কোনো পদ-পদবিতে ছিলেন না। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ছেড়ে দেওয়া আসনে নৌকা টিকিট নিয়ে নির্বাচিত হলে প্রথমবারের মতো সংসদে পা রাখতে যাচ্ছেন তিনি।

 বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম গত ১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগেও তিনি উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের অকাল মৃত্যুতে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম মেয়র আনিসুল হকও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ছিলেন। তবে ব্যবসায়ীর চেয়ে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে গ্লামার ছড়িয়ে সিভিল সোসাইটিতে তুমুল জনপ্রিয় মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। ছিলেন দলমতের ঊর্ধ্বে  সবার কাছে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। 

গত দশম সংসদের খুলনা-৪ আসনের এমপি এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, সাবেক কৃতী ফুটবলার আবদুস সালাম মুর্শেদী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। এক সময়ের বিএনপিপন্থি ফোরামের ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এলাকায় রাজনীতিতেও অবদান ছিল না। ২০১৮ সালের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপস্থিতিতে খুলনা সার্কিট হাউসের বিশাল সমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সালাম মুর্শেদী দলে সক্রিয় হন। এর আগে নিজ নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের গণসংযোগ ছিল না। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারিতেও তিনি নৌকা নিয়ে এমপি হয়েছেন। 

 রাজশাহী-৬ আসনে প্রথমবারের মতো নৌকা নিয়ে ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী শাহরিয়ার আলম।২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারির ভোটে নির্বাচিত হয়েও তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। পোশাক শিল্পের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ১৯৯৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন শাহরিয়ার আলম। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে নিটওয়্যার ক্যাটাগরিতে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি লাভ করেন তিনি। তবে রাজনীতিতে তিনি ভালো করছেন। রংপুর-৪ আসন থেকে গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে একটানা নির্বাচিত হয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী শিল্পপতি টিপু মুনশি। এবার তাকে দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব।

 তিনি রাজধানীর গুলশান থানা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কমিটিতেও।  সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে গত সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন তরুণ গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল মমিন মন্ডল। তার আগে এই আসনে দশম সংসদের এমপি ছিলেন তার পিতা ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ মন্ডল। রাজশাহী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি এনামুল হকও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। নরসিংদী-৩ আসনের এমপি জহুরুল হক ভূঁইয়া মোহন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এক সময় ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ বা এমপিদের আর্থিক সহযোগিতা দিতেন। এখন ব্যবসায়ীরা নিজেরাই রাজনীতিতে নাম লেখান। এর দুটি কারণ হতে পারে। একটি হলো ওই ব্যবসায়ীর অর্থ আছে কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, তাকে কেউ চেনেন না। আরেকটি হলো তার আরও অর্থবিত্ত চাই। এ কারণেও তারা এমপি হতে মরিয়া। অন্যদিকে রাজনীতি এখন ক্ষমতার। এটা করতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। শীর্ষ রাজনীতিবিদরাও চান টাকা-পয়সা। এ কারণে ব্যবসায়ীদেরও ছাড় দিতে হয়। আবার যারা রাজনীতি করেন, তাদের বড় অংশেরই কিছু না কিছু ব্যবসা আছে। নইলে তারা চাঁদাবাজি করে চলেন।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী  বলেন, আমাদের দেশে যে রাজনীতি চলছে তা কোনো ফর্মুলা অনুযায়ী চলে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী কিছু হলে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে পার্লামেন্টের এমপিদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন। ব্যবসায়ীরা যাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করে পার্লামেন্টে পাঠান তারা ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। 

এটা খোদ ভারতেও দেখা যায়। সেখানে টাটাসহ বড় বড় ব্যবসায়ী সব দলকেই সাহায্য করে। এখানে একটি উঁচু মানের বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো। এখানে গণতন্ত্র মাঝেমধ্যে হোঁচট খায়। আমাদের পুঁজিপতিরা লুটেরা। তারা তাদের অবৈধ টাকা রক্ষার জন্যই রাজনীতিতে নাম লেখান। সংসদ সদস্য হন। এতে তাদের কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না। এখন টাকা সুইচ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। নানাভাবে পাচার হচ্ছে। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুট হচ্ছে, ক্যাসিনোর বাজার তৈরি হচ্ছে। দলের রাজনীতি এখন পুঁজিপতি বা ব্যবসায়ীদের হাতে। 

সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে ১৮২ জনই পেশায় ব্যবসায়ী। অর্থাৎ ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ। স্বাধীনতার দুই বছর পর প্রথম নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ১৫ শতাংশ। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকেই রাজনীতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এখানে আসতে থাকেন ব্যবসায়ীরাও। ১৯৯৬ সালে ব্যবসায়ী এমপির হার হয় ৪৮ শতাংশ, ২০০১ সালের সংসদে এ হার দাঁড়ায় ৫১ শতাংশ। ২০০৮ সালে মোট এমপির ৬৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। আর দশম জাতীয় সংসদে অর্থাৎ ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যারা এমপি নির্বাচিত হন তাদের মধ্যে ১৭৭ জন কোনো না কোনো ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন, যা শতকরা হিসেবে ৫৯ শতাংশ। এখনো বহু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য পাইপ লাইনে আছেন। এর মধ্যে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি আরও নানা ধরনের ব্যবসায়ীও রয়েছেন।

মিডিয়া সূত্র প্রকাশ-যারা এতোদিন যাবৎ দলের ভেতরে গ্রুপ উপগ্রুপে বিভক্তি, কলহ-বিষোদগার ও নেতৃত্ব চালিয়ে আসছিলেন তাদের এবার ‘উচিৎ শিক্ষা’ দিয়ে দিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে সুপার চমক দিয়ে মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নৌকায় মনোনয়ন দিলেন। এরমাঝেই আছে দলীয় গ্রুপ-উপগ্রুপ, ক্যাডারবাজির লাগাম টেনে ধরতে নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার কড়াকড়ি ধরনের মেসেজ (বার্তা)। চট্টগ্রাম মহানগরীতে পানিবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক রাস্তাঘাটের সমস্যা, সমন্বয়ের অভাব, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ হরেক নাগরিক দুর্ভোগ এবং সরকারের উন্নয়নের সুফল থেকে চাটগাঁবাসী অনেকটাই বঞ্চিত হওয়ার পেছনে মূলত দায়ী ‘যত নেতা তত গ্রুপে’র মধ্যকার আর্থ-স্বার্থের লড়াই’।

‘এসব বিরোধ আর দলাদলির বাইরে পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে থাকা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়র পদে নৌকায় মনোনয়ন পাওয়া মানে- একজন ভদ্র-মার্জিত, মিতভাষী, সৎ, সুশিক্ষিত, দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত মাঠের নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধার যথার্থ মূল্যায়ন। যিনি চট্টগ্রাম নগরীর বনেদী পরিবারের সন্তান’। গতকাল রোববার চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের কয়েকজন মধ্যমসারির নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা উপরোক্ত মতামত ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

সবসময়ই রাজনীতি-সচেতন চাটগাঁবাসী। রাজনৈতিক অভিজ্ঞজনেরা জোরালো অভিমত দিয়েছেন, চট্টগ্রামে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার গুরুত্বটি সামনে চলে এসেছে রেজাউল করিম চৌধুরীর মূল্যায়নের ফলে। মেয়র পদে নৌকায় তার মনোনয়ন তদবির ও গৎবাঁধা নয়; বরং প্রচলিত ছকের বাইরে। তিনি মিডিয়ায় আলোচনায়ও ছিলেন না। এর মধ্যদিয়ে ইতিবাচক ধারায় রাজনীতির নয়া মেরুকরণের আভাস মিলছে। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য তা যেমনটি ইতিবাচক, ঠিক তেমনি সরকারের বাইরে থাকা বিএনপিসহ অন্যান্য দল-জোটের জন্যও শুভ ফলাফল বয়ে আনবে নিঃসন্দেহে।

গতকাল মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, তিনি নেত্রীর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিয়েছেন। নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান। তিনি চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে যে ভালোবাসা, দোয়া ও সমর্থন পেয়েছেন এরজন্য কৃতজ্ঞ বলেও জানান।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে আলাপকালে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, দলের সভাপতি-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং নিশ্চয়ই অনেক খোঁজ-খবর নিয়েই সিটি মেয়র পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন। মো. রেজাউল করিম চৌধুরী দীর্ঘদিনের ত্যাগী, মার্জিত, শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ নেতা এবং মাঠে সক্রিয় থাকেন। কোনো গ্রুপিংয়ের সাথে তার সম্পর্ক ছিলনা এবং নেই। তার মনোনয়ন যথার্থই। আমরা চট্টগ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধ সমর্থন নিয়ে নৌকা বিজয়ী করবো ইনশাআল্লাহ। সাইমুল চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ণ পাওয়া যায় এবং কোনো গ্রুপিং তদবিরও করতে হয়না এ বিষয়টা রেজাউল করিমের মনোনয়নের মধ্যদিয়ে বিচক্ষণ নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আরেকবার প্রমাণ এবং সবার জন্য একটা মেসেজ দিয়ে দিলেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকার মাঝি ‘রেজাউল করিম সুপার চমকে’র বিষয়টি এখন পর্যন্ত টক অব দ্য চট্টগ্রাম। সবখানে নানামুখী আলোচনা। যার সুর ইতিবাচক। এ নিয়ে বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ভেতরে-বাইরে চলছে ব্যাপক তোলপাড়।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগে ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপ’, ‘আ জ ম নাছির গ্রুপ’, ‘আবদুচ ছালাম গ্রুপ’, ‘নুরুল ইসলাম বিএসসি গ্রুপ’, ‘ডা. আফছারুল আমীন গ্রুপ’, ‘হাসিনা মহিউদ্দিন গ্রুপ’ ইত্যাদি নাম ও পরিচয়ে আন্তঃকোন্দল চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। যার জেরে অনেকগুলো উপদল সক্রিয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগেও। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অশান্তি অস্থিরতা। অবৈধ অস্ত্রের দাপট। এমনকি এই গ্রুপিংয়ের ধাক্কা গিয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী নেতাদের মাঝেও।

আসন্ন সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র পদে নৌকার মাঝি হওয়ার আশায় যে ১৯ জন দলীয় মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগই সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের একেকটি গ্রুপের নেতা অথবা প্রভাবশালী। সেই ১৯ জনের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগে গ্রুপিংয়ের তকমা নিয়ে দীর্ঘদিন কমবেশি আলোচিতরা হলেন- বর্তমান মেয়র ও দলের মহানগর সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, সহ-সভাপতি সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও তার পুত্র মুজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, ডা. আফছারুল আমীনের ভাই এরশাদুল আমীন।
সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি এবং কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের সঙ্গে অতীতে মরহুম মহিউদ্দিন চৌধুরীর দলীয় বিরোধ ছিল প্রবল। তবে এবার মেয়র পদে নৌকার মাঝি হতে মনোনয়নের জন্য ছালামের প্রতি মহিউদ্দিন পরিবারের সমর্থনের বিষয়টি ছিল আলোচিত। আবার বর্তমান মেয়র ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ঠেকানোর উদ্দেশে অধিকাংশ মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন কমবেশি একাট্টা। এ অবস্থায় নাছির এবার মেয়র পদের জন্য নৌকার মাঝি হতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনেকেই ছিলেন দোলাচলে।

মেয়র নাছির মনোনয়ন হারানোর পেছনে দলের ভেতরে গ্রুপিং ছাড়াও অন্যতম কারণ ছিল মহানগরীর পানিবদ্ধতা, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট সড়ক, যখন-তখন খোঁড়াখুড়ি, ধুলোবালির দূষণসহ ‘বার মাইস্যা দুঃখ’, ক্যাডারদের উৎপাত, আমলাদের সঙ্গে তার বিরোধের ঘটনা। চট্টগ্রাম মহানগরী এবং পাশ্ববর্তী ৫টি আসনেরই সরকার দলীয় এমপিদের সঙ্গেও রয়েছে তার দূরত্ব অথবা বিরোধ। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় দিকটি হচ্ছে, ছয় দফা মেয়াদকাল বাড়িয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান পদে আসীন থেকে অদৃশ্য শক্তিতে একের পর এক হাজার কোটি টাকার অঙ্কে বড়সড় উন্নয়ন বাজেট পেয়ে আসছিলেন আবদুচ ছালাম। অথচ বন্দরনগরী পানিবদ্ধতামুক্ত হলো না আজও। ওই সময়ে দৈনিক ইনকিলাবে সরেজমিনে সিরিজ নিউজ প্রকাশিত হয়- ‘টাকা পায় ছালাম- গালি খায় নাছির’ শিরোনামে। এসবের প্রেক্ষাপটে মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন, প্রতিদিনই প্রকল্পস্থলে গিয়ে কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শন, সমাজসেবামুখী কাজ, অন্যদিকে চট্টগ্রামে দলকে গোছানোসহ মেয়র এবং দলের মহানগর কান্ডারী হিসেবে নাছিরের অনেক ইতিবাচক সাফল্য, কর্মকান্ড কার্যত চাপা পড়ে গেছে।

সিটি মেয়র পদে শেখ হাসিনার চমক রেজাউল করিম চৌধুরীর দলীয় মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহে চলে আসা প্রকাশ্য কলহ-কোন্দল, গ্রুপিং হঠাৎ থমকে গেছে। গ্রুপিংয়ে পটু ছোট-বড় কোনো নেতাই এখন আর মুখ খুলতে নারাজ। সবাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকের ধারণা, ৫৫ জন কাউন্সিলর পদে নৌকার মনোনয়ন চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম নগরে বিশেষত থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গ্রুপিং মাথাচাড়া দিতে পারে।

রেজাউল করিমের অঙ্গীকার
সদ্য নৌকায় দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী গতকাল সাংবাদিকদের কাছে তার প্রাথমিক নির্বাচনী অঙ্গীকারে বলেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নগরবাসীর সেবায় আমার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়োজিত করবো। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমার নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞ। চট্টগ্রামবাসীর দোয়া ও সমর্থন আমি আশা করি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে, সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগের পরীক্ষায় আমি অবিচল থেকেছি। এখন বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের জনগণের সেবায় জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই।

চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ত ও প্রাচীন এলাকা ৬নং পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী ও বনেদী বহরর্দ্দার পরিবারে মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৩ সালের ৩১ মে। তিনি চান্দগাঁও স্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তবে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আইনে অধ্যয়ন সম্পন্ন করতে পারেননি।

১৯৬৭ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে যোগ দেন। ১৯৬৯-১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৭০-১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭২-১৯৭৬ সালে সভাপতি, ১৯৭০ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগ কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে দপ্তর সম্পাদক এবং ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ১৯৭৬-১৯৭৮ সালে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, ১৯৮০ সালে মহানগর যুবলীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য, ১৯৯২ মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য, ১৯৯৭-২০০৬ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, ২০০৬-২০১৪ সালে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ২০১৪ সাল থেকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাছাড়া তিনি মহানগরীসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, জনস্বার্থ ও জনকল্যাণমুখী কর্মকান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আত্মনিবেদিত।
৭১সংবাদ ডট কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
আরও খবর


সর্বশেষ সংবাদ
ঋণখেলাপি নীতিমালা শিথিলতার সময়সীমা তিন মাস বাড়ানো হচ্ছে
স্বর্ণের দাম ২৪৪৯ টাকা কমে, ভরির ৭৪ হাজার ৮ টাকা
দেশের মানুষ এ বছর নভেল করোনাভাইরাসের টিকা পাচ্ছেন না।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে শুরু হলো দেশীয় ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ শেয়ারের লেনদেন।
পাকিস্তান সফরে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পেল জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল
অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা
তজুমদ্দিনে ৩ কোটি টাকায় নির্মিত 'এসই এস ডিপি মডেল উচ্চবিদ্যালয়' মেঘনার গর্ভে বিলীন
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
এবার ফেঁসে যাচ্ছেন অবৈধ টাকা শিকারী একে এম সাহেদ রেজা, প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক
বগুড়ার শাজাহানপুরে মাস্ক,হ্যান্ডস্যানিটাইজার,সাবান ও করোনা ভাইরাসের সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ
ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি
আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন সাবিনা ইয়াসমিন
আমাকে কারাগারে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়েছে: অভিনেত্রী রিয়া
বেগম খালেদা জিয়ার ১৩তম কারামুক্তি দিবসে রাজশাহী মহানগর যুবদলের মিলাদ ও দোয়া মাহফিল
দুর্গা পূজার গান নিয়ে তারা তিনজন
Chief Advisor: A K M Mozammel Houqe MP
Minister, Ministry of Liberation War Affairs, Government of the People's Republic Bangladesh.
Editor & Publisher: A H M Tarek Chowdhury
Sub-Editor: S N Yousuf
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ৭১সংবাদ, ২০১৭
প্রধান কার্যালয় : ৫৩, মডার্ন ম্যানশন (১৪তলা), মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০
বার্তাকক্ষ : +৮৮-০২-৯৫৭৩১৭১, ০১৬৭৭-২১৯৮৮০, ০১৮৫৫-৫২৫৫৩৫
ই-মেইল :[email protected], [email protected], Web : www.71sangbad.com