
সমকালীন জ্ঞানতত্ত্ব এবং সামাজিক বিশ্লেষণে, কোনো বিশ্বাস ব্যবস্থা বা আদর্শিক চিন্তাধারাকে যখন ‘ইজম’ নামকরণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়, তখন তা সচরাচর একটি স্বতন্ত্র, নতুন এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে গড়ে ওঠা দার্শনিক কাঠামোকে নির্দেশ করে। ‘ইজম’ শব্দটি পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্ব থেকে উদ্ভূত; আর বাংলায় ‘বাদ’; উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা ‘যুক্তিবাদ’, ‘ভোগবাদ’, প্রকৃতিবাদ’ বা ‘পুঁজিবাদ’—এর মতো পরিভাষা ব্যবহার করি, তখন এর প্রত্যেকটিই নিজস্ব নীতিশাস্ত্র, জীবন দর্শন এবং মডেলকে উপস্থাপন করে। এই প্রেক্ষাপটে, ইসলামের গভীর আধ্যাত্মিক চর্চা ও অন্তর পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া তাসাউফ—কে যখন পশ্চিমা একাডেমিক পরিভাষায় ‘সুফিজম’ বা বাংলায় ‘সুফিবাদ’ নামে অভিহিত করা হয়, তখন জনমানসে এক মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এই বিভ্রান্তিটির নিরসন প্রয়োজন: তাসাউফ কি তবে ইসলামের মূল আকীদা (বিশ্বাস), শরিয়ত (আইন) বা ফিকহ (আইনশাস্ত্র)—এর বাইরে কোনো ভিন্ন পথ, নাকি এটি ইসলাম নামক মহীরুহের মধ্যেই একটি নতুন ও স্বাধীনভাবে বিকশিত শাখা?
বাস্তবতা হলো, তাসাউফকে কোনো নতুন, স্বাধীন বা বিচ্ছিন্ন ‘ইজম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা ইসলামের মূল উৎস, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং এর দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতার ফল। ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষণ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে তাসাউফ কোনো বহিরাগত বা আরোপিত মতবাদ নয়; বরং এটি হলো ইসলামী আধ্যাত্মিকতার সেই অবিচ্ছেদ্য মূলধারা, যা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর যুগ থেকে শুরু করে নিরবচ্ছিন্নভাবে কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা চালিত ও সমর্থিত হয়েছে।
‘তাসাউফ’ পরিভাষাটির মূল লক্ষ্য হলো মানব নফস (প্রবৃত্তি/আত্মা)—কে তার নেতিবাচক প্রবণতা থেকে মুক্ত করে তাজকিয়া (পরিশুদ্ধি)—র মাধ্যমে ঐশী প্রজ্ঞার দিকে চালিত করা। কোরআনুল কারীম এই আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি প্রক্রিয়াকে বারবার জোর দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—কে প্রেরণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে ‘ইউযাক্কিহিম’ বা ‘তাদেরকে পবিত্র করা/পরিশুদ্ধ করা’—এর কথা উল্লেখ করেছেন। এই তাযকিয়াতুন নফস (আত্মার পরিশুদ্ধি) কেবল নৈতিক উপদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, একজন বিশ্বাসীর অভ্যন্তরীণ জগৎকে আমূল পরিবর্তন করার সক্রিয় ও জীবনব্যাপী আধ্যাত্মিক অনুশীলন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই আধ্যাত্মিক পূর্ণতাকে ‘ইহসান’, ‘তাক্বওয়া’, ‘আদব’, ‘খওফ’, বা ‘মুহাব্বত’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত ইহসান হলো ইবাদতের সেই সর্বোচ্চ ও সচেতন স্তর, যেখানে বান্দা আল্লাহর উপস্থিতি এমনভাবে অনুভব করে যেন সে তাঁকে দেখছে। তাসাউফ মূলত শরিয়ত—এর আনুষ্ঠানিক বিধান পালনের পাশাপাশি এই ইহসান—এর মানসিকতা ও আত্মিক গুণাবলি অর্জনের একটি পদ্ধতিগত কাঠামো। এটি আল্লাহর নৈকট্য (কুরব) অর্জনের জন্য ইখলাস (আন্তরিকতা), সবর (ধৈর্য), যুহদ (পার্থিব বিষয়ে অনাগ্রহ), এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা)—এর মতো গুণাবলির গভীর চর্চাকে উৎসাহিত করে। এইভাবে, তাসাউফ হলো কুরআন—সুন্নাহ ভিত্তিক সেই রূহানী (আধ্যাত্মিক) পথ, যা ইসলামের আত্মিক সত্তাকে প্রকাশ করে।
‘সুফি’ শব্দটির পবিত্র উৎস নববী যুগের আহলে সুফফা—একদল দরবেশ, যাঁরা মসজিদে নববীতে ইলম ও যিকিরে নিমগ্ন থাকতেন। কিন্তু এর থেকে ‘সুফিজম’ নামকরণ এসেছে বহু পরে, উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের কলমে। ইউরোপীয় বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে— মিস্টিক ধারাগুলোকে বুঝাতে ‘রংস’ প্রত্যয় যুক্ত করার প্রচলন ছিল। ফলে তাসাউফকেও তারা একই ছাঁচে ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু এখানে মৌলিক ত্রুটি হলো— পশ্চিমা ‘ইজম’ সাধারণত প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প ধারণা। অথচ তাসাউফ কখনোই শরিয়তের বিকল্প দাবি করেনি; বরং শরিয়তের অভ্যন্তরীণ আত্মা। তাসাউফ কোনো নতুন আকীদা প্রণয়ন করেনি; কোনো ধর্মীয় আইন পরিবর্তন করেনি; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ধার্মিকতার ভেতরের রূহানী জীবনীশক্তিকে জাগ্রত করার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছে। সুতরাং ‘সুফিজম’ শব্দটি কেবল একাডেমিক সংকেতমাত্র; এটি তাসাউফের প্রকৃত দর্শনকে ধারণ করে না।
বাংলা ভাষায় ‘বাদ’ প্রত্যয় সাধারণত কোনো দর্শন, মতবাদ বা স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক কাঠামোকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সব ধারণার ক্ষেত্রে এই প্রত্যয় যুক্ত করা যথার্থ অর্থ প্রকাশ করে না। ‘সুফিবাদ’ শব্দটি এ কারণে ভাষাতাত্ত্বিক ও ধারণাগত—দুই দিক থেকেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। বাংলা ও পাশ্চাত্য—উভয় ভাষায় ‘বাদ’ বা ‘ইজম’ সাধারণত সেইসব দর্শনকে বোঝায়, যেগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি নতুন, স্বতন্ত্র বা বিকল্প মতাদর্শ তৈরি করে—যেমন বস্তুবাদ, উদারবাদ, সমাজতন্ত্রবাদ কিংবা নারীবাদ। এই প্রতিটি ‘বাদ’ একটি স্বাধীন চিন্তাধারা, যার নিজস্ব নীতি, জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো ও দার্শনিক অবস্থান রয়েছে।
এই ভাষাতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে ‘সুফিবাদ’ শব্দ ব্যবহারে এমন ধারণা জন্মায় যেন তাসাউফ হলো ইসলামের ভেতর থেকে নয়, বরং ইসলামের বাইরে গঠিত এক স্বাধীন মরমী বা দার্শনিক স্কুল। অথচ ইতিহাসগত ও ধর্মতাত্ত্বিক সত্য হলো—তাসাউফ কখনও কোনো স্বতন্ত্র মতবাদ ছিল না; বরং এটি ইসলামের অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক স্তরগুলোর ধারাবাহিক রূপ। নববী যুগ থেকেই কোরআন—সুন্নাহ ভিত্তিক যে আত্মিক অনুশীলন, চরিত্রগঠন ও অন্তরপরিশুদ্ধির শিক্ষা প্রচলিত ছিল, পরবর্তীকালে সেই ধারাটিই পদ্ধতিগত ও সংগঠিত রূপে ‘তাসাউফ’ নামে পরিচিত হয়েছে। সুতরাং, এটিকে ‘বাদ’—প্রত্যয়ে অভিহিত করা মানে তাসাউফকে ইসলামের মৌলিক কাঠামো থেকে আলাদা একটি নতুন মতবাদে পরিণত করা, যা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ভুল এবং ইতিহাসগতভাবে অসত্য।
তাসাউফের শেকড় অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এর উৎপত্তি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর জীবনে এবং প্রথম যুগের সাহাবায়ে কেরাম (রাদি আল্লাহু আনহুম)—এর আমলে নিহিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর হেরা গুহায় দীর্ঘ ধ্যান, রাতের কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ), এবং আল্লাহর যিকির (স্মরণ)—এ মগ্ন থাকার মধ্যে আজকের তাসাউফের প্রতিটি মৌলিক উপাদানের ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান ছিল। সাহাবায়ে কেরাম—এর জীবন, যেমন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাদ্বি.)—এর গভীর তাওয়াক্কুল ও বিনয়, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদ্বি.)—এর মুহাসাবা (আত্ম—হিসাব গ্রহণ), হযরত ওসমান (রাত্বি.)—এর লজ্জাশীলতা এবং দানশীলতা, বা হযরত মাওলা আলী (রাদ্বি.)—এর প্রজ্ঞা—এসবই ছিল তাসাউফ—এর বাস্তবায়ন। এই ধারাটিই পরবর্তীকালে হযরত হাসান বসরী (রহ.), হযরত রবেয়া বসরীয়া (রহ.), হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)—এর মতো প্রথম সারির সুফিগণ কেবল পদ্ধতিগতভাবে বিন্যস্ত করেছেন। তাঁরা কখনোই নিজেদেরকে শরিয়ত—এর বিরোধী বা স্বাধীন মনে করেননি; বরং তাঁদের সমস্ত শিক্ষাই ছিল কোরআন ও সুন্নাহ—এর আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে ইহসান অর্জনের প্রতি মনোনিবেশ করা।
চিরাচরিত ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় দেখা যায়—বাংলা ভাষার শব্দসম্ভার বহু উৎসের প্রভাব বহন করে। ফলে শব্দের গঠন, ব্যুৎপত্তি বা বহিরাগত প্রভাব নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন তোলার প্রবণতা প্রায়ই ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন—প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে। ‘মৌলবাদ’ কিংবা ‘সুফিবাদ’—এর মতো পরিভাষা নিয়ে সমকালীন বিতর্কও এই বৃহত্তর ভাষাতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই আবর্তিত হয়।
‘মৌলবাদ’ মূলত একটি ধর্মীয় ধারণার নির্দেশক শব্দ হলেও বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগে এটি প্রায়ই উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থী আচরণের সাথে যুক্ত হয়ে ওঠে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু তৌহিদি গোষ্ঠীর কার্যক্রম এই শব্দকে ইসলামি পরিমণ্ডলে আরও জটিল ও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—তৌহিদি জনতার ব্যানারে দেশে ২০০—রও বেশি মাজার ধ্বংস করা হয়েছে। কেবল স্থাপত্য ধ্বংসের মধ্যেই ঘটনা সীমাবদ্ধ থাকেনি; বহু মাজারে অগ্নিসংযোগ ঘটে, এবং একই সহিংসতায় কয়েকটি মসজিদও পুড়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—পবিত্র কুরআন শরীফ পর্যন্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ধর্মীয় অনুভূতি, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর সরাসরি আঘাত।
এতেও সীমা রক্ষা হয়নি। বিভিন্ন স্থানে কবর থেকে অক্ষত লাশ উত্তোলন, লাশকে টেনে—হিঁচড়ে লাঠিপেটা, এবং পরবর্তীতে পেট্রোল ঢেলে আগুনে দাহ করার মতো চরম সহিংস কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অগ্নিদাহের সময় লাশে লাঠি দিয়ে আঘাত ও খোঁচানো—এমন বর্বর আচরণও সর্বসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব ঘটনা ইসলামী শরিয়ত, সুন্নাহ এবং সাধারণ মানবাধিকার—সমস্ত নীতির বিরোধিতা করে। এই প্রেক্ষাপটে, মৌলবাদ শব্দের সাথে ‘বাদ’ প্রত্যয় যোগ করে একটি নতুন দর্শন ও মতবাদকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা ইসলামের মূল নীতির সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ এবং একটি স্বতন্ত্র আইডিওলজি হিসেবে বিবেচিত।
এই ধরনের উগ্রতা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের মূলধারার প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং ইতিহাসে বিদ্যমান বিভিন্ন বিচ্যুত মতবাদ—যেমন খারিজিজম, শিয়াইজম, ওয়াহাবিইজম, মওদুদিইজম—এর মতোই নতুন এক ধরণের বিচ্ছিন্ন ও চরমপন্থী ‘ইজম’—এর জন্ম দিতে পারে। এসব মতবাদ তাদের নিজস্ব আদর্শকে ধর্মের আসল শিক্ষা বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতায় মূলধারার ইসলামী চিন্তা ও আধ্যাত্মিক ধারাকে বিভ্রান্ত ও কলুষিত করে।
ফলত, উগ্রতার এই বেড়ে চলা প্রবণতা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যাই নয়; বরং সমাজ—সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ—সবকিছুর জন্যই এক গুরুতর হুমকি।
অনুরূপে, সুফিবাদ মূলত শরিয়ত সম্মত হলেও; উপমহাদেশে এমন এক আধ্যাত্মিক প্রথা বিস্তৃত হয়েছে, যা ইসলামের তাসাউফ দর্শনের মূল নীতি থেকে বিচ্যুত। ইসলামী তাসাউফে সুফি হওয়ার জন্য কেবল অন্তরের ভক্তি যথেষ্ট নয়; অবশ্যই শরিয়তের পূর্ণ জ্ঞান, কিতাবি শিক্ষা এবং সিনার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। প্রকৃত সুফির দরবার বা মাজারে এমন কোনো প্রথা থাকলেও তা সীমিত এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
সুফিবাদী প্রথায় শরিয়তের সীমা প্রায়শই লঙ্ঘিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রথার মধ্যে রয়েছে—মাজারে আগরবাতি বা মোমবাতি জ্বালানো, সেমা বা কাওয়ালীর শর্ত অনুসরণ না করে মরমী গান পরিবেশন, ধূপ জ্বালানো, মাজার বা কবরের পাশে কিংবা মন্দিরের সামনে খাবার রাখা, এবং মাজারের পাশে হুক্কা রাখা—যার মধ্যে তামাকও দেওয়া হয়, বিশ্বাস অনুযায়ী কবর থেকে পীর হুক্কা খাচ্ছেন। এছাড়া, নারী ও পুরুষ একসাথে ভক্তি প্রদর্শন, সিজদা করা, নাচ—গান চালানোও এই প্রথার মধ্যে প্রচলিত। অনেক দরবারে ওরস বা অনুষ্ঠানের সময় নারী শিল্পীদের দ্বারা গান পরিবেশন করা হয়।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, প্রকৃত সুফি জীবন হলো শরিয়তের পূর্ণতা, কিতাবি শিক্ষা এবং সিনার অভিজ্ঞতার সমন্বয়, যেখানে আচার—আচরণ ও নৈতিকতা সর্বদা সীমারেখার মধ্যে থাকে। অন্যদিকে, সুফিবাদ কেবল আড়াল বা মুখোশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা প্রায়শই নিজেকে “আহলে বায়আত প্রেমী” হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ বাস্তবে আহলে বায়আতের আধ্যাত্মিক চরিত্র—যেমন তাহাজ্জুদ, নামাজ, জিহাদ, কিতাবি ও সিনার জ্ঞান—তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। এটি নির্দেশ করে, সুফিবাদ বাস্তবে শরিয়তের সীমা অমান্য করে, সামাজিক ও নৈতিক অনিয়মকে উস্কানি দেয় এবং ইসলামী তাসাউফের মূল দর্শন থেকে বিচ্যুত।
এই গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক আলোচনার মাধ্যমে এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, তাসাউফ হলো ইসলাম—সমর্থিত, কোরআনের মূল শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত, এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সুন্নাহ দ্বারা চালিত একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ধারা। এটি কোনো নতুন ‘ইজম’ নয়। পশ্চিমা গবেষকদের দ্বারা আরোপিত ‘সুফিজম’ নামকরণের দুর্বলতা সত্ত্বেও, তাসাউফ ইসলামের মূল সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি হলো ইসলামের সেই প্রাণশক্তি, যা এর বাহ্যিক কাঠামোর (শরিয়ত) ভেতরে গভীর আন্তরিকতা (ইখলাস) যোগ করে। তবে, যেহেতু পশ্চিমারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে ‘ইজম’ শব্দের সংযুক্তি ঘটিয়েছে, এবং ফলস্বরূপ সুফিদর্শনের মধ্যে অ—ইসলামী আধ্যাত্মিক কর্মপদ্ধতির সংমিশ্রণে কলুষিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাই সুফি পন্থীদের উচিত, সুফিবাদ শব্দ ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং এর পরিবর্তে তাসাউফ শব্দটি ব্যবহার করা, যা সরাসরি ইসলামী উৎসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাসাউফ ইসলামের হৃদস্পন্দন, যা শরিয়ত, তরীকত (আধ্যাত্মিক পথ), মা’রিফত (ঐশী জ্ঞান) ও হাকীকত (চূড়ান্ত সত্য)—এর মাধ্যমে একজন বিশ্বাসীকে আল্লাহর কুরব ও ইহসান অর্জনের সর্বোচ্চ স্তরের দিকে পরিচালিত করে।