লোকসান কাটাতে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত চার মাসে

2026-08-12T17:17:53+00:00
2026-08-12T17:17:53+00:00
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত
Advertisement
 
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম: মার্কিন অবরোধের মধ্যেই খাড়গ দ্বীপে ইরানের তেল উত্তোলন শুরু      পরিসংখ্যানে জয়ের সুবাস পাচ্ছে বাংলাদেশ      ৭.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাঁপল ইন্দোনেশিয়া      গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না: নাহিদ ইসলাম       দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আগামীকাল      মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের চিঠি      দিনাজপুর জেলা জামায়াতের সাবেক কর্মপরিষদ সদস্যর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন      
লোকসান কাটাতে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৭ পিএম   (ভিজিট : ৩৭)
লোকসান কাটাতে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

লোকসান কাটাতে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

 আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত চার মাসে জ্বালানি তেল কিনতে গিয়ে সংস্থাটির যে বিপুল লোকসান হয়েছে, তা পূরণে সরকারের কাছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসের লোকসানের হিসাব ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ অর্থ চেয়েছে।

দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, বিপণন ও বিতরণের প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যই মূলত প্রতিষ্ঠানটির লাভ-লোকসান নির্ধারণ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও কম থাকায় বিপিসি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও বেড়ে যায়। অন্যদিকে দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় না করায় আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করতে হয়েছে বিপিসিকে।

বিপিসির হিসাবে, যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানির গড় দাম ছিল প্রায় ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে অকটেনের দামও ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে। জুনের শেষদিকে বাজার কিছুটা স্বস্তি দিলেও জুলাইয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় তেলের বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব বিপিসির ব্যয়ে সরাসরি পড়ে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল পরিবহনের ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানির কারণে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে।

এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দামের সময় বিপিসি সরকারের কাছে ভর্তুকির দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল। ওই চিঠিতে সংস্থাটি জানিয়েছিল, দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও তা আমদানিতে খরচ হচ্ছে ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেলে লোকসান দাঁড়ায় ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।

অকটেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়। প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি করা হলেও আমদানিতে ব্যয় হয় ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে প্রতি লিটারে লোকসান হয় ৩১ টাকা ৬১ পয়সা। ওই সময় দাম সমন্বয় না করা হলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল সংস্থাটি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়।

তবে দাম বাড়ানোর পরও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপিসির লোকসান থামেনি। এ অবস্থায় মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসের লোকসানের হিসাব করে নতুন করে ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২৮ জুলাইয়ের চিঠি অনুযায়ী, মার্চে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। মে মাসে লোকসান হয় ২ হাজার ৬২১ কোটি এবং জুনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। চার মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও দেশের বাজারে সেই অনুপাতে মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। সরবরাহ নিশ্চিত রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ না দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। তাই মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল কেনার বিপরীতে বিপিসিকে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিপুল লোকসানের মুখে পড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিসির আর্থিক অবস্থান বেশ শক্তিশালী ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে সংস্থাটি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে এ মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা বেড়েছে ২৭৩ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে খরচ হয়েছে ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল আমদানিতে খরচ হয়েছে আরও ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।

২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামার সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও ২০২২ সালে ডলার সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে একবারে প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়। তখন বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও দাম কমানোর কথা বলা হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, ভর্তুকির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো তার জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।

বিপিসির সাম্প্রতিক মুনাফা নিয়েও তিনি ব্যাখ্যা দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে ট্যাক্স ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারের একটি তহবিলেও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বিপিসির মুনাফার একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ প্রকল্প ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুধু বিপিসির হিসাবেই চাপ তৈরি করেনি, বরং সরকারের রাজস্ব, ভর্তুকি এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।









আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : এ এইচ এম তারেক চৌধুরী
সহ-সম্পাদক: এম এ ওয়াহেদ- ০১৮৫৯-৫০৬৬১৪

প্রধান কার্যালয় : নাহার ম্যানশন ৫ম তলা, ১৫০ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা -১০০০। নিউজ রুম: ০২৪৭১১০৪৫৪, ০১৮৮৬৩৩৩০৭৪।
e-mail: 71sangbad@gmail.com, web: 71sangbad.com