সুস্থ প্রজন্ম গড়তে শারীরিক শিক্ষা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়

সুধীর বরণ মাঝি

স্বাস্থ্য

এই সরল প্রবাদ বাক্যটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য। একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত অগ্রগতি দিয়ে পরিমাপ

2026-08-15T10:26:16+00:00
2026-08-15T10:26:16+00:00
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত
Advertisement
 
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম: মার্কিন অবরোধের মধ্যেই খাড়গ দ্বীপে ইরানের তেল উত্তোলন শুরু      পরিসংখ্যানে জয়ের সুবাস পাচ্ছে বাংলাদেশ      ৭.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে কাঁপল ইন্দোনেশিয়া      গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না: নাহিদ ইসলাম       দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আগামীকাল      মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের চিঠি      দিনাজপুর জেলা জামায়াতের সাবেক কর্মপরিষদ সদস্যর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন      
সুস্থ প্রজন্ম গড়তে শারীরিক শিক্ষা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়
করিলে খেলাধুলা সুস্থ সে রয়, না করিলে খেলাধুলা অসুস্থ সে হয়
সুধীর বরণ মাঝি
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৬ এএম   (ভিজিট : ৫৯)
সুস্থ প্রজন্ম গড়তে শারীরিক শিক্ষা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়

সুস্থ প্রজন্ম গড়তে শারীরিক শিক্ষা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়

এই সরল প্রবাদ বাক্যটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য। একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত অগ্রগতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন শারীরিকভাবে সুস্থ, মানসিকভাবে দৃঢ়, কর্মক্ষম ও নীতিবান নাগরিক। সেই সুনাগরিক গঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো 'শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা'। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দান করে, আর শারীরিক শিক্ষা মানুষকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিকভাবে গড়ে তোলে। শারীরিক শিক্ষা ছাড়া শিক্ষার পূর্ণতা আসে না; আর সুস্থ মানুষ ছাড়া উন্নত জাতি গড়ে ওঠে না।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এটি শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জার্মানিতে প্রচলিত একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য হলো— ‘আমরা হাসপাতাল চাই না, আমরা খেলার মাঠ ও ব্যায়ামাগার চাই।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর ২০১৫ সালের ‘কোয়ালিটি ফিজিক্যাল এডুকেশন’ (QPE) প্রতিবেদনে শারীরিক শিক্ষাকে শিশুর একটি মৌলিক অধিকার এবং গুণগত শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আমাদের প্রতিবেশী ও উন্নত বিশ্ব যখন শারীরিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুস্থ ও প্রতিযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলছে, তখন আমরা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে বিষয়টিকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে রাখছি। বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নবম ও দশম শ্রেণিতে “শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা” বিষয়টিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে—যেমন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে—শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মাধ্যমিক (SSC) এবং বিশ্ববিদ্যালয় (উচ্চশিক্ষা) পর্যায়ের ঠিক মাঝখানে, অর্থাৎ একাদশ ও দ্বাদশ (HSC) শ্রেণিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শারীরিক শিক্ষা কেবল মাঠের দৌড়ঝাঁপে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক চাহিদাসম্পন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক একাডেমিক ক্ষেত্র। বর্তমানে স্পোর্টস সায়েন্স, এক্সারসাইজ ফিজিওলজি, স্পোর্টস নিউট্রিশন, ফিটনেস ও স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট আন্তর্জাতিকভাবে সম্ভাবনাময় পেশাক্ষেত্র। 

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ ও নম্বরভিত্তিক পাঠ্যক্রম হিসেবে চালু করা হলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা স্পোর্টস সায়েন্স, এক্সারসাইজ ফিজিওলজি, স্পোর্টস নিউট্রিশন, ফিটনেস ও স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের মতো সম্ভাবনাময় পেশার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ প্রশিক্ষক, ক্রীড়া ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী তৈরির পথও সুগম হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে থাকে। এ সময়ে প্রযুক্তি ও স্ক্রিন-নির্ভর জীবনযাপন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির মতো ঝুঁকি তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। মানসিক বিষাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্য  আত্মহত্যার প্রবণতা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা এসব সমস্যার একটি কার্যকর ও স্বাভাবিক  প্রতিরোধমূলক উপায়। নিয়মিত শারীরিক চর্চা ও দলগত খেলাধুলা এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। খেলাধুলা মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্ব, দলগত চেতনা, সহনশীলতা এবং জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলে। ফলে তারা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। 

আমাদের দেশে নীতি নির্ধারণের অভাব নেই, অভাব সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অনুচ্ছেদ ২২.২-এ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও শরীরচর্চাকে অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, ক্রীড়া উপকরণ ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনও হতাশাজনক। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকের পদে ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়টির তাত্ত্বিক পাঠদান, ব্যবহারিক কার্যক্রম ও নিয়মিত ক্রীড়া চর্চা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়টিকে এখনও ‘অতিরিক্ত’ বা গৌণ হিসেবে দেখা হয়; শারীরিক শিক্ষার নির্ধারিত ক্লাসের সময়ও অন্য বিষয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। পর্যাপ্ত মাঠ, ক্রীড়া সরঞ্জাম ও সময়ের অভাবে শিক্ষকরা তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না।

শারীরিক শিক্ষকদের আক্ষেপ—“আমরা অলস নই, আমাদের অলস বানানো হয়েছে।” আমরা কাজ করতে চাই, শিক্ষার্থীদের মাঠে নিয়ে যেতে চাই, তাদের সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় পদ না থাকা এবং নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ঘাটতি আমাদের কাজের সুযোগ সংকুচিত করেছে। ফলে নিবেদিতপ্রাণ শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকরা তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অবদান রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সমস্যাটি শুধু মাঠ বা সরঞ্জামের নয়; শারীরিক শিক্ষার প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষাবিদ বুচার (Bucher)-এর মতে, শারীরিক শিক্ষা ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক বিকাশের মাধ্যমে তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আধুনিক শারীরিক শিক্ষা তাই শুধু শরীরচর্চা নয়; এটি জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিজ্ঞানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ডিসিপ্লিন। 

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে “শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা” বিষয়টি চালু করতে বিদ্যমান অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে ধাপে ধাপে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন—
১. উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিষয়টিকে পূর্ণাঙ্গ ও নম্বরভিত্তিক বিষয় হিসেবে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা;
২. সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ ও প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করা;
৩. রুটিনে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ এবং মাঠ ও ক্রীড়া সরঞ্জাম নিশ্চিত করা;
৪. শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা নিশ্চিত করা;
৫. বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের মূল্যায়ন কাঠামোয় যথাযথ স্থান দেওয়া।

শারীরিক শিক্ষা কোনো অতিরিক্ত বা বিলাসী বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীর সুস্থতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও কর্মক্ষমতা বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের মধ্যে এ বিষয়ের একটি ধারাবাহিক শিক্ষাপথ গড়ে তোলা সময়ের প্রয়োজন। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে “শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা” বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আমরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা প্রজন্ম চাই না; আমরা চাই সুস্থ, দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক। সেই লক্ষ্যেই এখন প্রয়োজন নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং শারীরিক শিক্ষাকে শিক্ষার মূলধারায় যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা।









আরও খবর


Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : এ এইচ এম তারেক চৌধুরী
সহ-সম্পাদক: এম এ ওয়াহেদ- ০১৮৫৯-৫০৬৬১৪

প্রধান কার্যালয় : নাহার ম্যানশন ৫ম তলা, ১৫০ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা -১০০০। নিউজ রুম: ০২৪৭১১০৪৫৪, ০১৮৮৬৩৩৩০৭৪।
e-mail: 71sangbad@gmail.com, web: 71sangbad.com