গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত
Advertisement
 
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম: অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাল দেশ''      পোর্ট লুইসে বাংলাদেশ হাইকমিশন বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি শোক বই উন্মুক্ত       আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার জানাজার খবর’’      ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার বাণী      খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন'      মায়ের জানাজায় যা বললেন তারেক রহমান      অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে শেষ বিদায়'      
মৌলবাদ কি ও প্রকৃত মৌলবাদী কারা?
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫, ৫:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ৭২২)
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বক্তব্যে বলেছেন, "দেশ যেন চরমপন্থী ও মৌলবাদের অভয়ারণ্য হয়ে না ওঠে" তার এ বক্তব্যের পর মৌলবাদী শব্দটি সোস্যাল মিডিয়া সহ দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই সেচ্ছায় নিজেকে গর্বিত মৌলবাদ বলে দাবি করছেন। আবার অনেকে জানেননা মৌলবাদ বা মৌলবাদী আসলে কি।

ছোট বেলা থেকেই আমরা মোটামুটি সবাই মৌলবাদ/ মৌলবাদী শব্দটির সাথে পরিচিত। মৌলবাদ শব্দটি কানে ভেসে আসলে মনের অজান্তেই অনেকের চোখে দাড়ি টুপি পাগড়িওয়ালা মানুষের ছবি ভেসে ওঠে। আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় কেউ প্রতিপক্ষকে মৌলবাদী ট্যাগ দিয়ে থাকেন। আমার ধারণা এই মৌলবাদী শব্দটি কেউ বুঝে কেউ না বুঝে ব্যবহার করে থাকেন। তাই আজ মৌলবাদী শব্দের আদ্যোপান্ত নিয়ে আলোচনা করব।

মৌল ও বাদ শব্দ দুটির সন্ধি হচ্ছে মৌলবাদ। সংসদ বাংলা অভিধানে মৌল শব্দের অর্থ হচ্ছে, মূল সম্বন্ধীয়, মূল হতে উৎপন্ন, আদিম। আর ‘বাদ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, মত (মতবাদ), তত্ত্ব ইত্যাদি। অর্থাৎ মৌলবাদ হচ্ছে, প্রাচীন ধর্মীয় শাস্ত্রবিধির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস।

মৌলবাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ- কোনো মতবাদের অবিকৃত মূলতত্ত্ব। যেকোনো বিশ্বাস,মতবাদ,আইনের সম্পূর্ণ পদানুসারী হওয়াই মৌলবাদ,আপনি তখনি একজন মৌলবাদী যখন আপনি কোনো নিয়মের সকল মূল বিষয় মেনে চলবেন! এক্ষেত্রে খেয়াল করবেন মৌলবাদ এর বহু প্রকারভেদ থাকতে পারে। যেমনঃ ধর্মীয় মৌলবাদ,রাজনৈতিক মৌলবাদ, আবার বৈজ্ঞানিক মৌলবাদ।

আপনি যখন আপনার ধর্মের সকল মূল স্তম্ভের সবকটি-ই মেনে চলবেন তখন আপনি একজন ধর্মীয় মৌলবাদী।একইভাবে আপনি রাজনীতির মূল বিষয়গুলো মেনে চলুন,তবে আপনি একজন রাজনৈতিক মৌলবাদী।বৈজ্ঞানিক মতবাদের আদর্শগুলো আপনি মেনে চলুন,তবে আপনি একজন বৈজ্ঞানিক মৌলবাদী। আপনি আপনাদের রাষ্ট্রের সংবিধান কট্ররভাবে মেনে চলুন অথবা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকুন তাহলে আপনি একজন রাষ্ট্রিয় মৌলবাদী।

সুতরাং,বোঝা যাচ্ছে যে মৌলবাদ কোন খারাপ গুণ নয়।বরং এটি একটি ভাল গুন যা না থাকার মানে হল আপনি নিজেরই ১০ টি দাবির মধ্যে কিছু মানেন আর কিছু মানেন না। আপনার বিশ্বাসে,আপনার স্তম্ভে,আপনার পূর্ণ আস্থা এবং সে মোতাবেক চলাই হল মৌলবাদীতা।

এক অর্থে, যে ব্যক্তি বা সম্প্রদায় নিজের মতের প্রতি গোঁড়া এবং অন্যের মতের প্রতি এতোটুকুও সহনশীল নয় সেই ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ও মৌলবাদী। বর্তমানে মৌলবাদ শুধু গোঁড়া ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। এই মৌলবাদ এখন সার্বজনীন সকল মতবাদের মধ্যে লক্ষণীয়। যেমন- আস্তিক, নাস্তিক, আঞ্চলিক, রাজনৈতিক, জাতিগত, বর্ণবাদী, জেন্ডারবাদী ইত্যাদি এবং সর্বত্র।

অনেকেই মৌলবাদকে জঙ্গিবাদের সাথে এক করে ফেলেন! কিন্তু না।এই দুইটা বিষয়কে এক করা যাবে না।সাধারন দুটি রাসায়নিক-কে এক করলে সেখানে বিস্ফোরন ঘটতে পারে! মৌলবাদী হলো তারা যারা কোন মতবাদের মৌলিকত্ব বা মৌলিক বিষয়গুলো ধারন করে ৷ মৌলবাদকে মূলজাতও বলতে পারেন ৷ আমাদের মুসলিমদের ইসলামী মতবাদের মূল বা শিকড় হলো কুরআন ও সুন্নাহ ৷ এখন যদি আমরা আমাদের মৌলিক বিষয় অর্থ্যাৎ কুরআন ও হাদিস পরিহার করি, তবে কি আমরা মুসলিম থাকবো? না, কুরআন ও হাদিস পরিহার করলে আমরা মুসলিম থাকব না ৷ যারা কুরআন ও হাদিস বিশ্বাস করে না তারা মুসলিম না, তারা কাফের ৷ এটা তো আমরা সবাই জানি ৷ সুতরাং মৌলবাদ মোটেই নেতিবাচক কিছু না ৷ বরং মৌলবাদ পরিত্যাগ করাই নেতিবাচক ৷

বিশিষ্ট লেখক আহমেদ ছফা এক উক্তিতে বলেছিলেন- 'যারা মৌলবাদী তারা শতকরা একশো ভাগ মৌলবাদী।কিন্তু যারা প্রগতিশীল বলে দাবী করে থাকেন তাদের কেউ কেউ দশ ভাগ প্রগতিশীল, পঞ্চাশ ভাগ সুবিধাবাদী, পনেরো ভাগ কাপুরুষ, পাঁচ ভাগ একেবারে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন'।

ডা: জাকির নায়েকের উদ্ধৃতি দিয়ে মৌলবাদ কী এবং মৌলবাদী ও চরমপন্থি বিষয়ে একটি লেখায় যুক্তি দেয়া হয়েছে এভাবে-

মৌলবাদী শব্দের অর্থ হলো যেকোন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর মূলনীতিগুলো মেনে চলা। মৌলবাদীরা যে যে ক্ষেত্রে মৌলবাদী, সেটা দেখে তারপর আপনার বিচার করতে হবে। যেমন ধরুন, একজন মৌলবাদী ডাকাত তার কাজ ডাকাতি করা। সে সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং অন্যদিকে একজন লোক মৌলবাদী ডাক্তার যে লোক হাজারও মানুষের জীবন বাঁচায়। সে সমাজের জন্য উপকারী, সব মৌলবাদীকেই এক মাপকাঠিতে মাপতে পারবেন না। আপনাকে দেখতে হবে যে, কোন ক্ষেত্রে মৌলবাদী। তারপর বলবেন সে ভাল না খারাপ। আমি আমার নিজের কথা বলতে পারি।

আমি একজন মুসলিম এবং আমি একজন মৌলবাদী মুসলিম হিসেবে গর্বিত। কারণ আমি সব সময় ইসলামের মূলনীতিগুলো মেনে চলার চেষ্টা করি। আর আমি জানি যে, ইসলাম ধর্মে এমন কোন মূলনীতি নেই যা সামগ্রিকভাবে মানবতার বিরুদ্ধে যায়। ইসলাম ধর্মের বিছু মূলনীতি আছে, সেগুলোকে অমুসলিমরা মনে করে মানবতার বিরুদ্ধে। কিন্তু আপনি যদি সেই নীতিগুলোকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলেন, আর বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলেন, এমন একজনও নিরপেক্ষ লোকও পাবেন না, যে লোক ইসলাম ধর্মের একটিমাত্র মূলনীতি খুঁজে বের করবে, যেটি সামগ্রিকভাবে মানবতার বিরুদ্ধে যায়। এজন্য আমি একজন মৌলবাদী মুসলিম হিসেবে গর্বিত। ওয়েবস্টার ডিকশনারী পড়লে সেখানে দেখতে পাবেন এই মৌলবাদী শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছি প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের বুঝাতে।

অন্যদিকে বলা হয়েছে যে মৌলবাদী হলো একজন ব্যক্তি, যে ধর্মের প্রাচীন নিয়মগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করে, বিশেষভাবে ইসলামে এই কথাটি এখন জুড়ে দেয়া হয়েছে। যখনি আপনি মৌলবাদী কথাটি শুনবেন। আপনি কোন মুসলিমের কথা ভাববেন। সে চরমপন্থী, সে সন্ত্রাসী, মিডিয়া বলে বেড়ায় যে মুসলিমরা চরমপন্থী। আমি তা স্বীকার করবো যে আমি চরমপন্থী, চরমভাবে দয়ালু, চরমভাবে ক্ষমাশীল, চরমভাবে সৎ, চরমভাবে ন্যায়বান। তবে কোন সমস্যা নেই আমি হই চরম দয়ালু, চরম ন্যায়বান, চরম সৎ। অসুবিধা কোথায় ? আপনারা কেউ কি বলতে পারবেন যে, চরমভাবে সৎ হওয়াটা খারাপ? এমনভাবে কেউ কি আমাকে বলতে পারবে যে চরমভাবে ন্যায়বান হওয়া খারাপ দিক? কোরআন বলছে তোমরা চরম ন্যায়বান হও। আমরাতো আংশিকভাবে সৎ হবো না। যে লোক আমার বন্ধু তার কাছে সৎ থাকবো, আর যে আমার শত্রু তার কাছে সৎ থাকবো না।

বাংলা ভাষায় মৌলবাদ শব্দটির ব্যবহার খুব বেশী দিনের নয়।উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের আগে বাংলার কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক,প্রাবন্ধিক,কবি বা সমাজসংস্কারক কারো লেখাতেই মৌলবাদ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় না।এমনকি আমরা দেখেছি ১৯০০ শতাব্দীর আগে ইংরেজীতেও শব্দটির অস্তিত্ব ছিল না।‘মুসলিম মৌলবাদ’/হিন্দু মৌলবাদ শব্দগুলি জনপ্রিয় হয়েছে মূলত: এ অঞ্চলের কিছু মুসলিম ও হিন্দু (শিবসেনা, আরএসএস, তালেবান,আলকায়দা)গ্রুপের কার্যাকলাপের ফলে।

তবে শব্দটির অপপ্রয়োগই বেশী হচ্ছে।আধুনিক মুসলিম মৌলবাদের শুরু ইরান বা আফগানিস্তানে সত্তর দশকের শেষের দিকে।কিন্তু দেখা যায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একশ্রেনীর ইংরেজী শেখা আধুনিক(!)মানুষ সাধারনভাবে মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্র, ইমাম-মোয়াজ্জিন,মিলাদ ও বিষেশাদি পড়ানো মৌলভী এবং অতিমাত্রায় নামাজ-কালাম পড়া মুসলিমকে কাঠমোল্লা,ধর্মান্ধ,কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করত এবং সম্ভবত পঁচাত্তর পরবর্তীকালে ইসলামধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল বিশেষত জামাতের রাজনীতি শুরুর পর(১৯৭৬ এরপর)মৌলবাদ শব্দটির ব্যবহার জোরেসোরে ও যত্রতত্র শুরু হয়েছে।

এখন বিষযটি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে,দেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এমন অনেক প্রগতিবাদী তরুন-তরুনী আছে যারা মুসলিমদের টুপি,দাড়ি,নামাজ,রোজা,এমনকি দাঁত মেছওয়াক করাকেও মৌলবাদী আচরণ বলে মনেকরে।সামগ্রিকভাবে এখন শিল্প, সাহিত্য,নাটক,নভেল যাতেই ইসলামের গন্ধ পাওয়া যায় তাকেই মৌলবাদ আখ্যায়িত করার একটা রেওয়াজ/ট্রাডিশন বেশ জোরেশোরেই চালু হয়ে গেছে।আসলে ওরা ধর্মীয় গোড়ামি আর মৌলবাদকে এক করে ফেলেছে।কিন্তু এ দুটি কখনোই এক বিষয় নয়।

প্রকৃতপক্ষে সর্বকালেই মুসলিম বিশ্বে মৌলবাদের (ধর্মের আদি ও অকৃত্রিম অবস্থা মেনে চলা অর্থে) এক স্বত:সিদ্ধ আকাঙ্খা।ইসলামের জন্মলগ্নে যা কিছু ছিল তার আক্ষরিক পুন:প্রকাশ ও পুন:প্রবর্তন চাই- ইসলামের ইতিহাসে বারবার উঠেছে এই দাবী।ইসলামীকরণ যেহেতু একটি নিত্যঘটমান ধারা তাই আরব মরুভূমি থেকে এই ধর্ম যত আরব বহির্ভূত পৃথিবীতে ছড়িয়েছে,যত ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠির পরশে এসেছে ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকগন অনুভব করেছেন আরবের ইসলাম আর এই ইসলাম এক নয়। ততই তাঁরা শুদ্ধিকরণের দিকে ঝুঁকেছেন।আর বলেছেন আক্ষরিক অর্থে ধর্মপালন করার অর্থই হলো ধর্ম রক্ষা করা।

একটি কথা মনে রাখা আবশ্যক,ইসলামি মৌলবাদের সাথে খৃষ্ট্রীয় মৌলবাদের মৌলিক পার্থক্য হলো- খৃষ্ট্রীয় মৌলবাদ যেখানে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বর দ্বারা পৃথিবী শাসন করতে চায়, ইসলামি মৌলবাদ সেখানে রাসুল(সা) বা খুলাফায়েরাশেদিনের প্রতিষ্ঠিত ন্যায় ভিত্তিক সমাজকে পূন:প্রতিষ্ঠিত করতে চায় মাত্র।কোরআনে পরধর্মের প্রতি বিদ্বেষের কোন স্থান নেই।কোরআন শুধু মুসলিমের মুক্তির কথা বলে না,সমগ্র মানব জাতির কথা বলে।

পরিশেষে বোঝা গেল, আমরা সবাই কোন না কোন দিক থেকে এক একজন মৌলবাদী বা মৌলবাদী মানসিকতার। আমাদের দেশে বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে নেতৃত্ব শ্রেনীর মানুষেরা, নিজেদের ভিতরে মৌলবাদী সকল (নেতিবাচক/ইতিবাচক) চিন্তা-বিশ্বাস পোষণ করে, প্রতিপক্ষকে হেয় করতে নেতিবাচক অর্থে মৌলবাদী শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। সুতরাং মৌলবাদের সংজ্ঞা বৈশিষ্ট্য না জেনে কাউকে মৌলবাদ আখ্যায়িত করাও ধরনের মৌলবাদী আচরণ।








আরও খবর


সম্পাদক ও প্রকাশক : এ এইচ এম তারেক চৌধুরী
সহ-সম্পাদক: এম এ ওয়াহেদ- ০১৮৫৯-৫০৬৬১৪

প্রধান কার্যালয় : নাহার ম্যানশন ৫ম তলা, ১৫০ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা -১০০০। নিউজ রুম: ০২৪৭১১০৪৫৪, ০১৮৮৬৩৩৩০৭৪।
e-mail: 71sangbad@gmail.com, web: 71sangbad.com