
মবোক্রেসি কোনো এক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন মবোক্রেসি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে; কিন্তু সেই শক্তি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না, বরং জনজীবনে সহিংসতা আতংক ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক বন্ধন দূর্বল ও কঠিন অনাচারের জন্ম দেয়।
ভারতে সা¤প্রতিক বছরগুলোতে গুজব ভিত্তিক গণপিটুনির ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সন্দেহের ভিত্তিতে যে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, পরে দেখা গেছে অভিযোগ ছিল ভিত্তিহীন বা শুধুই গুজব। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সনে মব ভায়োলেন্স বা মব লিঞ্চিকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানে ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় গুজব ভিত্তিক সহিংসতা ২০১৮ সনে রাষ্ট্রকে জরুরী অবস্থা জারি করতে বাধ্য করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রেরও অতীতে বর্ণবাদীগণ হামলা এবং সা¤প্রতিক সময়েও জনতার সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আইনের বাইরে গিয়ে সহিংসতা সমাজকে বিভক্ত করে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অসহায় করে ফেলে। নাইজেরিয়ার মব ভায়োলেন্স বা ‘জঙ্গল জাস্টিস’ এবং লাতিন আমেরিকার কিছু দেশেও নিজ হাতে বিচার শুরু করে সহিংসতার পথ অবলম্বন করেছিল।
এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্ট করে বলে মবোক্রেসি মব ভায়োলেন্স বা ‘জঙ্গল জাস্টিস’ কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশে সা¤প্রতিক কয়েকটি গুজব ভিত্তিক গণপিটুনি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সহিংসতা, পত্রিকা অফিস সহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর অগ্নি সংযোগ এবং সর্বশেষ মবোক্রেসির মাধ্যমে ১৮ ডিসেম্বর ময়মসিংহে ভালুকায় গার্মেন্টস শ্রমিক দিপু দাসকে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে ভারতীয় রামসেনা সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আগুন, হাই কমিশনে বিক্ষোভ ও মিডিয়ায় প্লাটফর্মে প্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ¤øান করে চলেছে। র্যাব ঐ ঘটনায় ৭ জন আসমী গ্রেফতার করেছে। প্রকৃত পক্ষে একজন ব্যক্তির বিচারের মাধ্যমে মব ভায়োলেন্স এর অপরাধের বিচার হবে না, কারন মব ভায়োলেন্স সৃষ্টি করে শুধু একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, রাষ্ট্র, জাতী ও সামাজের ভাবমূর্তি বিপন্ন করে। একারনে রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান রক্ষার প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট গঠন করে মব ভায়োলেন্স এর সাথে যারা যুক্ত, ইন্ধন বা উস্কানী দাতা এবং এর পিছনে অর্থ দাতাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যেহেতু সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেহেতু অংশগ্রহনকারী প্রতিটি দলকে মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধে সু-স্পষ্ট অঙ্গীকার ও ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি ভালো হবে।
আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রকে শুধু পরিচালিতই করে না, বরং তার নৈতিক ভিত্তিও দেয়। কিন্তু যখন আইন কার্যকর থাকে না, বিচার দীর্ঘ সূত্রতায় পড়ে যায় এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি দৃঢ় হয়, তখন সমাজে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতা কখনোই শূন্য থাকে না। সেখানে জায়গা করে নেয় মবোক্রেসি।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জামানায় দূর্নীতি, লুটপাট, রাষ্ট্রিয় প্রতিষ্ঠান গুলোকে ধ্বংস করে একনায়ক তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পরেছিল। ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে সমাজের সর্বস্তরের জনগনের বিস্ফোরণে ১৪০০ প্রানের বিনিময়ে ৫ আগস্ট, ২০২৪ গণঅভ‚্যত্থানে জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশ। বিজ্ঞান বলে প্রতিটি পরিবর্তনই তার পরবর্তী পরিবর্তনের বীজ রোপন করে যায়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কথায়-কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আওয়ামী দুঃশাসনের নজির স্থাপনের পরিনতিতে দলটি ক্ষমতায় থেকেও ভারতে পালিয়ে যেতে হয়। তেমনই ২৪ গণঅভ‚্যত্থানের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গণন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পরবর্তীতে মবতন্ত্র চর্চা করলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শক্তির পরিনতি আবারও ভিন্ন নামে ফ্যাসিস্ট সরকার ফিরে আসতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে সব জনসাধারণের আন্দোলনই মবোক্রেসি। উদাহরণ স্বরূপ, ৫ আগস্ট ২০২৪, বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের ন্যায়ের দাবির প্রকাশ। এটি ছিল সুশৃঙ্খল, লক্ষ্যভিত্তিক এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যা মবোক্রেসির সংজ্ঞার বাইরে পড়ে। সুশৃঙ্খল গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রকে সতর্ক করে এবং পরিবর্তনের সুযোগ দেয়।