গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত
Advertisement
 
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম: অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাল দেশ''      পোর্ট লুইসে বাংলাদেশ হাইকমিশন বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি শোক বই উন্মুক্ত       আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার জানাজার খবর’’      ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার বাণী      খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন'      মায়ের জানাজায় যা বললেন তারেক রহমান      অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে শেষ বিদায়'      
প্রাচীন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার প্রভাব :
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:৩৫ এএম   (ভিজিট : ২৩২)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষত প্রাচীন চট্টগ্রাম, ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সমুদ্রবাণিজ্য, ধর্মীয় আদান–প্রদান এবং বহুজাতিক সংস্কৃতির অন্যতম মিলনভূমি হিসেবে পরিচিত। আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার বণিক, সুফি, দার্শনিক, সৈন্যবাহিনী এবং অভিবাসী মানুষের ধারাবাহিক আগমন চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক ভাষার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম বৈচিত্র্যগুলোর একটি হিসেবে চাটগাঁইয়া ভাষার শব্দভাণ্ডার, ধ্বনি–রূপ, বাক্যগঠন ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে আরবি–ফারসি–উর্দু ভাষার প্রভাব আজ একটি ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক সত্য।

চট্টগ্রাম উপকূল সপ্তম  হিজরি থেকেই আরব বণিকদের অন্যতম নিরাপদ অবতরণস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ইসলামের প্রারম্ভিক আগমন এবং আরব সুফিদের প্রভাব এই অঞ্চলে আরবি শব্দসম্ভারকে দ্রুত সাধারণ মানুষের কথ্যভাষায় স্থায়ী করে তোলে। নামাজ, রোজা, ঈমান, কোরআন, নিয়ত, হালাল–হারাম, আমানত, ফিতরা, দোয়া—এমন বহু আরবি শব্দ আঞ্চলিক উচ্চারণভেদে রূপান্তরিত হয়ে চাটগাঁইয়া ভাষার সঙ্গে মিশে যায়। ফরজ–ফরজ্জ, সালাত্তি, নামাজ্জির ইত্যাদি ধ্বনিগত পরিবর্তন চাটগাঁইয়া ভাষার স্বাভাবিক ধ্বনি–প্রকৃতির অনুকরণে গঠিত হয়েছে।

মধ্যযুগে বাংলার প্রশাসন, রাজস্ব, বিচারব্যবস্থা ও রাজদরবারে ফারসি ছিল সরকারিভাষা। এর ফলে ফারসি শব্দ চট্টগ্রামে সর্বাধিক গভীর ও বিস্তৃত প্রভাব তৈরি করে। দরবার, দস্তুর, রেজিস্টার, খাজনা, দস্তার, হাকিম, মহল, বকশিশ, আশকারা—এই ধরনের শব্দ প্রশাসনিক ও পেশাগত পরিভাষা হিসেবে প্রাচীন চট্টগ্রামের সমাজজীবনে প্রচলিত হয়। চাটগাঁইয়া উচ্চারণে এদের বিশেষ রূপান্তর দেখা যায়—বাকশিস, দকুমেন্টো, দরবারি ইত্যাদি। চট্টগ্রামের পুঁথি সাহিত্য, লোকগাঁথা, সুফি কাব্যেও ফারসি রস–ধারায় গঠিত বহু শব্দ ও উপমা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ও ড. আহমদ শরীফের ঐতিহাসিক গবেষণাসমূহ এসব ভাষাগত ধারার বৈধতা তুলে ধরেছে।

মুঘল আমল ও ঔপনিবেশিক যুগে উর্দুভাষী সৈন্য, পাইক-লস্কর, প্রশাসনিক কর্মচারী এবং উত্তর ভারতীয় শ্রমিকদের আগমনে চট্টগ্রামে উর্দু শব্দের বিস্তার ঘটে। আদাব, জানালা, জোশ, খুশি, বরফ, দোকান, কিসিম, খবর, সাবান—এ জাতীয় শব্দ দৈনন্দিন কথোপকথনে এমন সহজে আত্মস্থ হয় যে এগুলোর ভাষাগত উৎস আজ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের অজানা। চাটগাঁইয়া ধ্বনিপরিবর্তনে এ শব্দগুলি আদব, খুসি, বোরফ ইত্যাদি রূপে ব্যবহৃত হয়।

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে চাটগাঁইয়া ভাষায় আরবি–ফারসি–উর্দু প্রভাব তিনভাবে চিহ্নিত—
১. শব্দ ধার (Lexical Borrowing) :
ধর্মীয় শব্দ (আরবি), প্রশাসনিক–সামাজিক শব্দ (ফারসি), ও দৈনন্দিন জীবনের মিশ্র শব্দ (উর্দু)।
২. ধ্বনিগত অভিযোজন (Phonological Adaptation) :
চাটগাঁইয়া ‘জ্জ’, ‘ট্ট’, ‘ফ’, ‘ঘ’ ধ্বনির প্রভাবে বিদেশি শব্দের স্বরূপ-পরিবর্তন।
৩. বাক্যগঠনগত প্রভাব (Syntactic Influence) :
ফারসি ধাঁচে যৌগ শব্দ ও বিশেষণ ব্যবহারের ধারা—যেমন: খাস কাম, নাদান লোক, দস্তুর মতো।
চট্টগ্রামের সামুদ্রিক বন্দর প্রাচীনকাল থেকেই আরব–পারস্য–মধ্য এশীয় যোগাযোগের সেতুবন্ধন ছিল। সুফি সাধকদের আগমন ধর্মীয় শব্দবিস্তারে ভূমিকা রেখেছে; মধ্যযুগীয় প্রশাসনে ফারসি ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস ফারসি শব্দকে সামাজিক-আদালত সংস্কৃতির মূলভিত্তি করেছে; মুঘল–ব্রিটিশ যুগে উর্দুভাষী মানবপ্রবাহ উর্দু শব্দকে ভাষার চলতি রূপে পরিণত করেছে।
প্রাচীন চট্টগ্রামের ধর্মীয় সাহিত্য, সুফি কাব্য, লোকগীতি, মরমি সংগীত ও পুঁথি রচনায় এসব প্রভাবের অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে।যেমন : আহাদিসুল খাওয়ানিন (খান বাহাদুর হামিদউল্লাহ খাঁ), দিওয়ানে ওয়াইসী (রসুলনোমা সুফি ফতেহ আলী ওয়াইসী), দিওয়ানে আজিজ-  ( আল্লামা সৈয়দ আজিজুল হক শেরে বাংলা আলকাদেরী ) এর  রচনাসমূহ নির্দিষ্ট প্রমাণ।
চাটগাঁইয়া ভাষায় কিছু ফারসি শব্দের ব্যবহার: 
কাজী — বিচারক
হুকুম — আদেশ
তামিল — বাস্তবায়ন
গরহাজির — অনুপস্থিত
ফয়সালা — নিষ্পত্তি
আখের — শেষ
মাজার — কবর
হায়াত — আয়ু
গোলমাল — ঝামেলা
মশগুল — ব্যস্ত
ডর — ভয়
ইনসাফ — ন্যায়বিচার
গরিব — দরিদ্র
কদর — মর্যাদা
লাখো — লক্ষ
শহর — শহর।
চাটগাঁইয়া ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার :
ইজতেমা — মিলিত বা সম্মিলিত
আহমক — বোকা
ফেতনা — মতবিরোধ
ফকির — দরিদ্র
কিচ্ছা — কাহিনী
কামরা — কক্ষ - রুম 
জাকাত — জাকাত
ছদকা — দান
মুনাফিক — অবাধ্য/অকৃতজ্ঞ
মুসিবত — বিপদ
নসীহত — উপদেশ
হাবা  — নির্বোধ
ইয়াতিম — পিতৃহীন।
চাটগাঁইয়া ভাষায় উর্দু শব্দের ব্যবহার :
কাউয়া — কাক
আব্বু/ ব্বাজি — পিতা
আম্মু — মা
শেয়ানা — বুদ্ধিমান / হাবিল 
বাহাদুর — বীর - হাবিল 
সিপাহী — সৈনিক
ময়দান — মাঠ
দরোয়াজা — দরজা 
মদর পো — ছেলে
জনম —  জিন্দেগী 
বেটা — ছেলে
বেটি — মেয়ে।

উল্লেখিত ভাষা–শব্দ ছাড়াও বহু শত শত আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দ আমাদের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে মিশে গিয়ে আজ চাটগাঁইয়া ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
ফলে চাটগাঁইয়া ভাষা শুধু বাংলা ভাষার আঞ্চলিক রূপ নয়; এটি বহু শতাব্দীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ইতিহাস ও মানবসংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়া এক সমৃদ্ধ ভাষার –ঐতিহ্য। আরবি–ফারসি–উর্দু প্রভাবে গঠিত এই ভাষাগত বৈচিত্র্য চট্টগ্রামের ইতিহাসকে যেমন বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তেমনি বাংলা ভাষার সামগ্রিক বিকাশেও যোগ করে এক অনন্য অধ্যায়—যা মানুষের মুখের ভাষা হয়ে জনে জনে টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।
--------------
লেখক : সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, পরিচালক ও সম্পাদক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ (ইতিহাসের পাঠশালা) ; সভাপতি, মুসলমান ইতিহাস সমিতি , বাংলাদেশ।









আরও খবর


সম্পাদক ও প্রকাশক : এ এইচ এম তারেক চৌধুরী
সহ-সম্পাদক: এম এ ওয়াহেদ- ০১৮৫৯-৫০৬৬১৪

প্রধান কার্যালয় : নাহার ম্যানশন ৫ম তলা, ১৫০ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা -১০০০। নিউজ রুম: ০২৪৭১১০৪৫৪, ০১৮৮৬৩৩৩০৭৪।
e-mail: 71sangbad@gmail.com, web: 71sangbad.com