বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রত্যেকটি দল অন্যের প্রতি বিরোধিতার ভিত্তিতে নিজেদের পরিচয় নির্মাণ করছে। এই বিরোধিতা কেবল মতাদর্শগত সীমায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সাময়িক স্বার্থ রক্ষার চাপের কারণে এক ভয়াবহ বৈরিতার চক্রে পরিণত হয়েছে। দেশের রাজনীতির ভেতরে আজ পুরাতন ও উদীয়মান শক্তি মিলিয়ে এমন এক ধরণের বিরোধী রাজনীতির জন্ম হয়েছে, যেখানে ঐক্য একটি অপ্রাপ্ত স্বপ্ন এবং প্রতিযোগিতা এক বহুধাবিভক্ত দহনমুখী কাঠামো।
গণ অধিকার পরিষদের মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, বিএনপি ও জামায়াতের দূরত্ব, এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থান, চরমোনাই ও জামায়াতের মাঝে ইস্যুভিত্তিক যোগাযোগ এবং হেফাজতের চরমোনাই ও জামায়াতবিরোধী মনোভাব—এসব বাস্তবতা দেখিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল একটি অভিন্ন বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি একই ইসলামপন্থী ছাতার নিচে দাঁড়ানো দলগুলোর মধ্যেও গভীর মতপার্থক্য ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব বিরাজমান। ফলে দেশে কোনো নির্দিষ্ট নীতিনির্ভর জোট গড়ে উঠছে না, বরং সব দলই পারস্পরিক সন্দেহের দেয়াল তুলে নিজেদের ক্ষমতার হিসাব সাজাচ্ছে।
ঐতিহাসিক সত্য হলো, বৃটিশরা এ দেশ থেকে সম্পদ লুণ্ঠন করে তাদের রাজধানীতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক বৈভব গড়ে তুলেছিল। আজকের বাংলাদেশেও ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতালোভী অনেক রাজনৈতিক শক্তি একই ধাঁচে রাষ্ট্রীয় সম্পদ শোষণ করে বিদেশে বিলাসী সাম্রাজ্য নির্মাণে রত। পার্থক্য কেবল এতটুকুই যে, বৃটিশরা বহিরাগত উপনিবেশবাদী ছিল, আর আজকের রাজনীতিবিদরা দেশীয় উপনিবেশবাদী প্রভু হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে। লন্ডন, দুবাই কিংবা ইউরোপের অভিজাত পল্লীগুলো বর্তমানে তাদের অবৈধ অর্থের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। দেশের গরিব মানুষ যখন জীবনধারণের সংগ্রামে লিপ্ত, তখন রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সন্তানরা বিদেশি পল্লীতে ভোগবিলাসের স্বর্গরাজ্যে নিমজ্জিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয়ের আরেকটি দুঃখজনক দিক হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত দখলদারিত্ব ও দলীয় একনায়কতন্ত্র। যে দল ক্ষমতায় যায়, তারাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মেশিন হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা হয়, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, মামলার মাধ্যমে বিরোধী নেতাদের হয়রানি করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বহির্ভূত প্রভাব প্রয়োগ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্র দখলে রাখা হয়। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে দলীয় নেতারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের থেকেও প্রভাবশালী অবস্থান নিয়ে নেয়। এই অবস্থায় রাষ্ট্রধর্ম, জাতীয়তাবাদ কিংবা উদার গণতন্ত্র—সবই রাজনৈতিক প্রলোভনের ভোটস্লোগানে পরিণত হয়, কিন্তু বাস্তবে জনগণ কেবল নির্যাতিত হয় ক্ষমতার জুলুমে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বাস্তবতা এখন দৃশ্যমান, তা হলো দলীয় প্রতিযোগিতা উন্নয়ন বা মতাদর্শভিত্তিক নয়, বরং এটি দখল, শোষণ ও বিস্তৃত আর্থিক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভূমিদখল, দুর্নীতি এবং মাফিয়াখিরি যেন এখন রাজনীতির এক অঘোষিত অংশ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো মানেই অর্থনৈতিক শক্তি হারানো; আর ক্ষমতায় থাকা মানেই প্রচলিত আইনকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক এলিটদের জন্য অবাধ সুযোগ সৃষ্টি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে: আগামীর বাংলাদেশ কেমন হতে পারে? দেশের ভবিষ্যৎ সামনে দুটি সুস্পষ্ট পথে অগ্রসর হতে পারে। একদিকে, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের লোভ ও বৈরিতা অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসনব্যবস্থার পথে ফিরে যেতে পারে, তাহলে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সুশাসনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে, যদি দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক সংঘর্ষ ও বিভাজন বাড়াতে থাকে, তাহলে দেশ আরেক দফা অস্থিরতা, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক পতনের দিকে ধাবিত হতে পারে।
যে বাস্তবতাই সামনে আসুক, একটি বিষয় নিশ্চিত—দেশের মানুষ আর লুণ্ঠন, দখল ও প্রতারণার রাজনীতি চায় না। তারা চায় জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায়সংগত ব্যবহারের নিশ্চয়তা। তারা চায়, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্রস্বার্থে এক মঞ্চে বসুক। তারা চায়, ভয়ের রাজনীতি নয়, আস্থার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হোক।
অতএব, বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য বিচ্যুতিও তাকে রাজনৈতিক নৈরাজ্যের অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে। আবার বিচক্ষণ ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এই দেশ সুশাসন, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের স্বচ্ছ ভবিষ্যৎও অর্জন করতে পারে। যদি ক্ষমতালোভ দমিত হয় এবং দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়, তবে এই দেশের রাজনীতি পুনর্জন্ম নিতে পারে নতুন আভায়। অন্যথায়, বৃটিশ সাম্রাজ্যের মতো বিদেশি পল্লীতে নির্মিত বিলাসী উপনিবেশে এ জাতির নেতৃত্ব চিরকাল পালিয়ে বেড়াবে, আর দেশবাসী ভুগবে অনিশ্চয়তা ও শোষণের অনন্ত চক্রে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সময় প্রশ্ন করার নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেয়ার। রাজনীতি যদি জনগণের সেবক হয়ে ফিরে আসে, তাহলে দেশ সুশাসনের পথে এগোবে। কিন্তু যদি এটি ক্ষমতার অহঙ্কারী প্রভু হয়েই থাকে, তাহলে অস্থিরতার গোধূলি আরও দীর্ঘ হবে। আজকের রাজনৈতিক বিভক্তি যদি আলোচনায় পরিণত হয়, তাহলে হয়ত আগামীকাল আমরা নতুন ভোরের সূচনা প্রত্যক্ষ করতে পারবো।