
মালদ্বীপে স্ট্রোকে বাংলাদেশিদের মৃত্যু যেন অনেকটাই নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। চলতি বছর দেশটিতে ৩০ প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ হাইকমিশন বলছে, স্বদেশ বা স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাসহ নানা মানসিক চাপের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্ট্রোক বা হৃদরোগে মৃত্যুর হার বেশি। বাংলাদেশ মিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩০ প্রবাসী বাংলাদেশির জীবনাবসান ঘটেছে, যাদের অধিকাংশই হৃদরোগ ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ১৮ জন বৈধ কর্মী এবং ১২ জন অনিবন্ধিত কর্মী ছিলেন।
এর মধ্যে ২ জনের আত্মহত্যা ও ৩ জন সড়ক দুর্ঘটনায় এবং বাকি ২৫ জন স্ট্রোক বা হৃদরোগে মারা যান। এদের মধ্যে ১৯ জনের মরদেহ তাদের কোম্পানির আর্থায়নে এবং দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে প্রেরণ করা হয়েছে।
তবে ১১জন প্রবাসী বাংলাদেশি অবৈধ থাকায় তাদের মরদেহগুলো দূতাবাসের সহযোগিতায় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্বদেশে পাঠানো হয়েছে। গত অর্থবছরে মালদ্বীপে মোট ৪১ জন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। যাদের মধ্যে ২৮ জন বৈধ কর্মী এবং ১৩ জন অনিবন্ধিত কর্মী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তবে এরই মধ্যে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাত্র চারদিনের ব্যবধানে ৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক বা হৃদরোগ।এদের অধিকাংশেরই বয়স ২৫-৪০ বছরের মধ্যে।
সোমবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে মৃত্যুজনিত এ ঘটনাগুলোর প্রতি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ এবং স্থানীয় হিমাগারের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে সেখানে পরিদর্শনে যান মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনার ড. মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম। এসময় তিনি হিমাগারে থাকা ৪ প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে হিমাগার কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেন। এই ছয় প্রবাসীর মৃত্যুর খবরে মালদ্বীপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার জন্য প্রার্থনা করেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মিশনের কাউন্সেলর (শ্রম) মো. সোহেল পারভেজ ৭১ সংবাদকে বলেন, মৃত ছয় প্রবাসীর মধ্যে দুইজনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে। দূতাবাসের সহযোগিতায় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে বাকি মরদেহগুলোও যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্বদেশে পাঠানো হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর পেছনে অভিবাসন ব্যয়ের তুলনায় কম আয়, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিন স্বদেশ-স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একাকিত্বই প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্ট্রোক বা হৃদরোগের প্রধান কারণ।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসীদের এ ধরনের অকালমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ মিশনের কল্যাণ সহকারী মো. জসিম উদ্দিন ৭১ সংবাদকে বলেন, মৃত ছয় বাংলাদেশির একজন সজিব আহমেদ। তার পিতার নাম রোস্তম আলী। তার দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার তামাট বাজার ইউনিয়নে। সজিব মাত্র দুই মাস আগে মালদ্বীপে এসেছিলেন। পাঁচদিন আগে স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। দ্বিতীয় জনের নাম আলম, তার পিতার নাম চান মিয়া। তার দেশের বাড়ি গাজীপুর জেলা,কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নে। মরহুম আলম কর্মরত অবস্থায় স্ট্রোক করে মারা যান। তৃতীয়জনের নাম রাসেল, তার পিতার নাম মরহুম মফিজ উদ্দিন। তার দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার গাফরগাঁও উপজেলার জয়দান খাল গ্রামে।
মরহুম রাসেল সেনটারা গ্র্যান্ড রিসোর্টে প্রায় এক বছর ধরে কাজ করতেন। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো সেদিনও জিমে যান। সেখানে হঠাৎ স্ট্রোক করলে সহকর্মীরা দ্রুত তাকে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যান। গুরুতর অবস্থা দেখে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজধানী মালের এডিকে হাসপাতালে। প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চতুর্থজন মো. ইমরান হোসেন, তার পিতার নাম ইকরাম হোসেন ভূঁইয়া। দেশের বাড়ি কুমিল্লা জেলার, বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নে। মরহুম ইমরান যশ নেচার রিসোর্টে কাজ করতেন। কর্মস্থলেই তিনি আত্মহত্যা করে মারা যান।
পঞ্চমজন রহমান মিয়া, তার পিতার নাম এদু মিয়া। দেশের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে। মরহুম রহমান কর্মক্ষেত্রে দূর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ষষ্ঠজনের নাম ইমরান হোসেন,তার পিতার নাম দাউদ গাজী।দেশের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার,আশাশুনি উপজেলায়।মরহুম ইমরান বেশ কিছুদিন আগে মালদ্বীপের ফুভাহমুলাহ আইল্যান্ডে রোড এক্সিডেন্ট করে রাজধানী মালের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান।
অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের প্রত্যাশায় এ প্রবাস জীবনে পা রাখা,এমন অসংখ্য বাংলাদেশির অকালপ্রয়াণ প্রবাস জীবনের বাস্তবতার নৃশংস রূপকে আরও প্রকট করে তুলছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।