
শীত আসে নীরবে, কিন্তু তার প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। কুয়াশা ঢাকা ভোর, সূর্যের অনুপস্থিতি, ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে শীত অনেকের কাছে আনন্দের হলেও আমাদের মা–বাবার জন্য এটি হয়ে ওঠে বাড়তি কষ্টের সময়। বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া শরীর, কমে যাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে শীতকাল তাঁদের জন্য নীরব এক সংগ্রামের নাম। আমরা যারা কর্মব্যস্ত জীবনে শীত উপভোগ করি, অনেক সময় ভুলে যাই—এই শীতটাই আমাদের মা–বাবার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ত্বক পাতলা হয়, রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায়, পেশি ও অস্থিসন্ধির স্থিতিস্থাপকতা কমে আসে। ফলে সামান্য ঠান্ডাও বয়স্ক মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শীতকালে মা–বাবাদের মধ্যে সর্দি–কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, হৃদরোগের জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ, বাতব্যথা এবং ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ঠান্ডাই বড় রোগের সূচনা করে দেয়।
শীতের সময় মা–বাবার যত্নের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উষ্ণতা নিশ্চিত করা। তাঁদের পোশাক হতে হবে এমন, যা হালকা হলেও শরীরকে পর্যাপ্ত উষ্ণতা দিতে পারে। উলের সোয়েটার, শাল, মাফলার, টুপি এবং মোজা শীতের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিশেষ করে মাথা, ঘাড় ও পা উষ্ণ রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এসব অংশ দিয়ে শরীরের তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়। রাতে ঘুমানোর সময় মোটা কম্বল বা কাঁথা ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত কম্বলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ঘরের পরিবেশও মা–বাবার সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শীতকালে জানালা বা দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়লে তা বন্ধ করা প্রয়োজন। গ্রামের বাড়িতে মেঝে বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়, ফলে হাঁটু ও কোমরের ব্যথা বাড়ে। এ ক্ষেত্রে চট, মাদুর বা কার্পেট ব্যবহার করা যেতে পারে। শহরের ফ্ল্যাটে হিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুষ্কতা এড়াতে সতর্ক থাকা দরকার।
শীতকালীন খাদ্যাভ্যাস মা–বাবার সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই সময় তাঁদের খাবার হওয়া উচিত পুষ্টিকর, সহজপাচ্য এবং শরীরকে উষ্ণতা প্রদানকারী। গরম ভাত, খিচুড়ি, স্যুপ, ডাল, শাকসবজি, কুমড়া, গাজর ও মিষ্টি আলু শীতের জন্য উপযোগী খাদ্য। আদা, রসুন ও কালোজিরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। মৌসুমি ফল যেমন কমলা, মাল্টা, পেয়ারা শরীরের ভিটামিনের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে।
শীতে অনেক মা–বাবা পানি কম পান, কারণ ঠান্ডায় তৃষ্ণা কম লাগে। কিন্তু এটি একটি বড় ভুল। পানি কম খেলে কিডনি সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তচাপের জটিলতা বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত হালকা গরম পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। চা বা কফির অতিরিক্ত ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা উচিত, কারণ এগুলো শরীরকে পানিশূন্য করে।
শীতকালে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। মা–বাবার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নজরে রাখা প্রয়োজন। শীত শুরুর আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা উচিত। অনেক সময় বয়স্করা নিজের ইচ্ছেমতো ব্যথানাশক বা ঠান্ডার ওষুধ খেয়ে ফেলেন, যা পরবর্তীতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। সন্তানদের উচিত ওষুধ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
ত্বক ও শারীরিক পরিচর্যাও শীতকালে বিশেষ গুরুত্ব পায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের আর্দ্রতা কমে যায়, ফলে শীতে ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার বা সরিষার তেল ব্যবহার করলে ত্বক সুরক্ষিত থাকে। অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে গোসল এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এতে ত্বকের স্বাভাবিক তেল নষ্ট হয়। ঠোঁট ফাটা রোধে তেল বা লিপবাম ব্যবহার করা যেতে পারে।
শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মানসিক যত্ন শীতকালে মা–বাবার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অথচ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শীত মানেই দীর্ঘ রাত, কম চলাফেরা এবং একাকিত্ব। বিশেষ করে যেসব মা–বাবার সন্তান শহরে বা বিদেশে থাকেন, তাঁদের জন্য শীতকাল মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টের সময়। নিয়মিত ফোন করা, খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা—এই ছোট ছোট বিষয়ই তাঁদের মানসিক উষ্ণতা দেয়।
মা–বাবার সঙ্গে সময় কাটানো শীতের অন্যতম সেরা যত্ন। পুরোনো স্মৃতি নিয়ে কথা বলা, তাঁদের জীবনের গল্প শোনা, নাতি–নাতনিদের ছবি দেখানো কিংবা একসঙ্গে বসে টেলিভিশনের পছন্দের অনুষ্ঠান দেখা—এসবই তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। মানসিক প্রশান্তি অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতাও কমিয়ে দেয়।
গ্রাম ও শহরের বাস্তবতায় শীতকালীন চ্যালেঞ্জ ভিন্ন হলেও গুরুত্ব সমান। গ্রামে চিকিৎসা সুবিধার অভাব, কুয়াশা ও তীব্র ঠান্ডা মা–বাবার ঝুঁকি বাড়ায়। শহরে আবার সন্তানদের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিক জীবন মা–বাবাকে একাকী করে তোলে। উভয় ক্ষেত্রেই সন্তানদের সচেতন ভূমিকা অপরিহার্য।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মা–বাবার যত্ন অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। ইসলামে মা–বাবার সেবা ইবাদতের মর্যাদা পেয়েছে। তাঁদের কষ্ট লাঘব করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং আত্মিক উন্নতিরও মাধ্যম। শীতের সময় তাঁদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া আমাদের নৈতিকতা ও বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন।
শীতকালে অবহেলার পরিণতি অনেক সময় ভয়াবহ হয়। প্রতি বছর অসংখ্য বয়স্ক মানুষ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, কেউ কেউ প্রাণও হারান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সামান্য সচেতনতা ও সময়মতো যত্ন নিলে এই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
শীত আসে ও যায়, কিন্তু মা–বাবার বয়স বাড়ে প্রতিদিন। আজ যারা আমাদের শীত–গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে বড় করেছেন, আজ তাদের হাত–পা কাঁপে শীতে। এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—মা–বাবার যত্ন কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি আমাদের দায়।
শীতের সময় মা–বাবার যত্ন মানে শুধু কম্বল দেওয়া নয়; এর অর্থ ভালোবাসা, সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও মানবিক দায়িত্ব পালন। আজ আমরা যদি তাঁদের শীত উষ্ণ করতে পারি, তবেই আমাদের সমাজ উষ্ণ থাকবে, আমাদের মানবিকতা বেঁচে থাকবে।
তৌফিক সুলতান,প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ,কাপাসিয়া, গাজীপুর।