
লেখকের প্রেরণা ও উদ্দেশ্য
এই প্রবন্ধ রচনার অন্তরে যে অনুপ্রেরণার অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছে, তা সাধারণ সাহিত্যচর্চার ফল নয়। এটি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে ওঠা এক আহ্বান, যা খোদাপ্রেম ও নবীপ্রেমের অশ্রুধারায় সিক্ত। পৃথিবীর কোলাহলে মানুষ তার প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই সময়ে সুফি সাধকগণের জীবন ও ত্যাগ আমাদের জন্য আলোর দিশারী। আমি সেই আলোর কণিকাগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি, যাতে পাঠকের অন্তরেও প্রেমের শিখা জ্বলে ওঠে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কেবল তথ্য প্রদান নয়; বরং পাঠককে নিয়ে যাওয়া এক আধ্যাত্মিক সফরে—যেখানে প্রতিটি শব্দ হবে ধ্যান, প্রতিটি বাক্য হবে যিকির, এবং প্রতিটি অংশ হবে প্রেমের দরবারে নতুন পদক্ষেপ।
বকশী বাজার খানকা: শহরের হৃদয়ে শান্তির আশ্রয়
ঢাকার কোলাহলমুখর হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে বকশী বাজার খানকা—এক শান্তির আশ্রয়স্থল। এটি কেবল ইট—পাথরের ভবন নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক মরুদ্যান, যেখানে ক্লান্ত হৃদয় খুঁজে পায় প্রশান্তি, অস্থির আত্মা খুঁজে পায় শান্তি, আর বিভ্রান্ত মানুষ খুঁজে পায় আল্লাহর নৈকট্যের আলো। খানকার প্রতিটি প্রাচীর, প্রতিটি দরবার, প্রতিটি যিকিরের আসর যেন সাক্ষ্য দেয় গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার। এখানে মানুষ আসে নিজেকে শুদ্ধ করতে, নবপ্রাণ লাভ করতে এবং অন্তরের শান্তি খুঁজতে। পুরান ঢাকার মানুষদের কাছে এটি কেবল খানকা নয়, বরং আত্মার দিশারি, প্রেমের মসজিদ, শান্তির কাবা। খানকার ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় সময় থেমে গেছে—বাহিরের গাড়ি হর্ন, মানুষের ভিড়, বাজারের কোলাহল; কিন্তু ভেতরে শান্তির নীরবতা, যেখানে প্রতিধ্বনিত হয় দরুদ, যিকির, হামদ ও নবীপ্রেমের সুর।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: হাফেজ মাওলানা জহুরুল হক মোবারকি (রহ.)
বকশী বাজার খানকার আধ্যাত্মিক ইতিহাস শুরু হয় একজন মহান সাধকের আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে—হাফেজ মাওলানা জহুরুল হক মোবারকি (রহ.)। নবীপ্রেম ও খোদাপ্রেমের জ্যোতিতে দীপ্ত এই সুফি সাধক ছিলেন কবি, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক এবং জনগণের শিক্ষাগুরু। ২০শ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার পুরান অংশে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রবল ছিল। প্রতিটি গলি—মহল্লায় মুশায়েরা হতো, মিলাদ কিয়াম হতো, যিকিরের আসর বসত। জহুরুল হক মোবারকি (রহ.) ছিলেন এই ধারার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর কবিতায় নবীপ্রেম ঝলসে উঠত, কণ্ঠে হামদ ও দরুদ শোনার সময় মানুষ কেঁদে ফেলত, আর মজলিসে বসে মানুষ অনুভব করত খোদার নূরের ছোঁয়া। তিনি কেবল বক্তা বা কবি হতে চাননি; আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ আত্মার প্রশান্তি খুঁজে পাবে, বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি পাবে, আর নবী (সা.) এর প্রেমে জেগে উঠবে। প্রথমে, ১৯৫০—এর দশকে ঢাকার নন্দকুমার দত্ত রোডে ‘কাদেরী মঞ্জিল’ নামে একটি ছোট্ট খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে শুরু হয় যিকির, দরুদ, মিলাদ মাহফিল এবং মরমী কবিতার আসর। দ্রুতই চারপাশের মানুষ আকৃষ্ট হয়। ক্রমবর্ধমান ভক্তসমাজ ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের বিস্তার তাঁকে স্থানান্তর ও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। অবশেষে, ১৯৫৯ সালে খানকাটি স্থানান্তরিত করা হয় বর্তমান স্থানে—বকশী বাজারে। এখানেই তাঁর স্বপ্ন পূর্ণতা পায়। প্রতিটি ইটে মিশে থাকে প্রতিষ্ঠাতার ভালোবাসা, প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর যিকির, প্রতিটি মজলিসে অনুভূত হয় তাঁর আত্মার স্নিগ্ধতা। বকশী বাজার খানকার ইতিহাস কেবল প্রতিষ্ঠান গড়ার গল্প নয়, বরং এক প্রেমিক সাধকের আত্মিক সাধনার গল্প—যিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্রভুর প্রেমকে মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলতে, এবং সফল হয়েছেন এক নূরের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায়।
নবীপ্রেমের পথিকৃৎ কবি—সাহিত্যিক সুফি জহুরুল হক মোবারকি
বিংশ শতাব্দীর ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ও নবীপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন, হাফেজ মাওলানা জহুরুল হক মোবারকি আল—কাদেরী (রহ.) বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন স্মরণীয় ও বরণীয় সুফি ব্যক্তিত্ব। এ মহান বুযুর্গ খোদাপ্রেম, নবীপ্রেম ও আউলিয়ায়ে কেরামগণের শানে প্রেমের কবিতা ও সাহিত্য লিখে বঙ্গদেশে যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মগুলো মানুষের ক্বলবে নবীপ্রেমের চেরাগ জ্বালিয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের সন্ধান যুগিয়েছে।
শৈশব ও পরিবার
এই মহান কীর্তিমান সাধকপুরুষ ১৯২১ সালে পুরান ঢাকার চকবাজারস্থ ২ নং চুড়িহাট্টায় মুসলিম সম্ভ্রান্ত হেকিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। সর্বাগ্রজ ভ্রাতা মুহাম্মদ ফজলুল হক ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রসিদ্ধ আইনজীবী ও শরৎচন্দ্র বসুর সহযোগী; পরবর্তীতে ঢাকা হাই কোর্টের বিচারপতি পদে যোগদান করেন। মেজো ভ্রাতা মুহাম্মদ নুরুল হক ছিলেন একজন ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানী। পিতা মৌলভী হেকিম জাকারিয়া ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহসহ নবাব পরিবারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। পিতামহ মৌলভী হেকিম মোজাফফর হোসেন এলাহী বক্শ এবং প্রপিতামহ হেকিম নবী বক্শ ছিলেন ঢাকার নায়েবে নাজিম ও “তারিখ—ই—নুসরত জঙ্গ” প্রণেতা নুসরত জঙ্গের শাসন আমলের সুপ্রসিদ্ধ হেকিম। হেকিম নবী বক্শ ভারতের উত্তর প্রদেশে বসবাস করতেন।
শিক্ষাজীবন
হাফেজ জহুরুল হক (রহ.)—এর বাল্যজীবন এবং শিক্ষাজীবন ভারতের কলকাতায় অতিবাহিত হয়। পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি উর্দু ও ফারসি ভাষার বুৎপত্তিগত জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে সুনামধন্য আলেম ও হাফেজের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআনুল কারীম মুখস্থ করেন; তৎপর কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানার্জন করেন। তিনি এতই প্রতিভাবান ও মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন যে, যেকোনো বিষয় একবার পড়লে সহজেই আয়ত্ত করতে পারতেন। তিনি খুব উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, সবসময় সুন্নাত মোতাবেক জীবনযাপন করতেন। খুবই বিনয়ী ও শান্ত প্রকৃতির ছিলেন।
ভাষাগত দিক দিয়ে ফারসি ও উর্দু ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন বিধায় ১২ বছর বয়স তথা ১৯৩৩ সাল থেকেই খোদাপ্রেম ও নবীপ্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেন; পাশাপাশি আবৃত্তিও করতেন। সেকালে তাঁর লিখিত কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো এবং স্বকণ্ঠে স্বরচিত কবিতাগুলো রেডিওতে প্রচারিত হতো। ভাষাগত ও ব্যাকরণগত শৈল্পিকতা তাঁর লেখার মানকে আরো সুরভিত করে তুলত। সুমধুর কবিতাগুলোর শব্দচয়ন, শব্দগঠন ও শব্দবিন্যাস ছিল অত্যন্ত ছন্দময়।
সাহিত্যকর্মের সূত্রপাত
সাহিত্য জগতে তাঁর প্রবেশের কারণ ছিল তৎকালীন সময়ে তাঁর পিতার স্ব—উদ্যোগে ধর্মীয় ও সাহিত্য বিষয়ক মুশায়েরা মাহফিলের আয়োজন। অধিকাংশ প্রোগ্রাম তাঁদের বাসায় অনুষ্ঠিত হতো। ঈদের সময়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিশেষ বিশেষ দিনে কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন হতো—যা ছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তামূলক প্রোগ্রাম।
আধ্যাত্মিক প্রেরণা ও কীর্তি
সুফি জহুরুল হক (রহ.)—এর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অন্তরে ইশকে ইলাহী এবং ইশকে মুস্তফা (সা.) বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি একজন কামেল পীরের সন্ধানে ছিলেন, যিনি তাঁকে মঞ্জিলে মকসুদ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন। এক মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি দেখা পেলেন পাকিস্তানের পেশোয়ার নগরীর শায়খুত তরিক্বতের শাহ সুফি মোবারক শাহ (রহ.)—এর সাথে। তিনি কাদেরীয়া ও নকশবন্দীয়া তরীক্বতের একজন মাশায়েখ ছিলেন। কালক্ষেপণ না করে জহুরুল হক (রহ.) তাঁর হাতে কাদেরীয়া ও নকশবন্দীয়া সিলসিলায় মুরিদ হন এবং কঠোর সাধনাজীবন অতিবাহিত করেন। আত্মোৎকর্ষ সাধন হলে তিনি ইশকে ইলাহী ও হুব্বে মুস্তফা (সা.)—এর প্রতি আত্মোৎসর্গিত হয়ে ইলমে মারিফতের সত্যনিগূঢ় তত্ত্ব আহরণের চেষ্টা করেন। সাহিত্য বিষয়ক কবিতা লেখার পাশাপাশি অসংখ্য হামদে বারী তা‘আলা, নাতে রাসূল (সা.) ও পীর—আউলিয়াদের শানে মানাক্বাত রচনা করেন। সাহিত্যকর্মগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ঢাকা প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী জনাব আবদুল গফুর ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর ‘গাযালানে হারাম’ নামক একটি দেওয়ান প্রকাশ করেন। এটি উর্দু সাহিত্যের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন গুরুত্বপূর্ণ দীওয়ান। তাঁর লিখিত কবিতাগুলো আবৃত্তি করলে মানুষের অন্তরে ইশকে ইলাহীর জোশ সৃষ্টি হতো। রাসূলুল্লাহ (সা.) কবিতা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে কবিতাকে জ্ঞানের বাহক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : “নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতায় জ্ঞানের কথা আছে” (সহিহ বুখারি, হাদিস—৬১৪৫)। রাসূলুল্লাহ (সা.) কবিতা শুনতেন এবং কবিদের উৎসাহ যোগাতেন। তিনি বিভিন্ন সময় কবিদের জন্য দোয়া করেছেন। যেমন হাসসান বিন সাবিত (রাঃ)—এর উদ্দেশ্যে বলেছেন : “হে হাসসান, তুমি আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে প্রত্যুত্তর দাও। হে আল্লাহ! আপনি জিবরাইল দ্বারা তাকে সাহায্য করুন” (সহিহ বুখারি, হাদিস—৬১৫২)।
আবৃত্তি ও খ্যাতি
ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডস্থ (বর্তমানে শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজ) পাকিস্তান আমলে ঢাকা কেন্দ্রের রেডিও স্টেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি ড. আল্লামা ইকবালের একটি নাত সুললিত কণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলেন। এতে সবাই মুগ্ধ হয়ে আত্মহারা হয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আগমন করলে রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মাঠে এক সভায় তিনি একটি নাত আবৃত্তি করেছিলেন। হাজার হাজার মানুষ তাঁর সুমধুর কণ্ঠের নাত শুনে অভিভূত হয়ে তাঁকে ‘বুলবুল—ই—বাঙ্গাল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। হাফেজ জহুর মোবারকি (রহ.) তৎকালীন পাকিস্তানের রেডিও স্টেশন ঢাকা, করাচি ও লাহোর বেতার কেন্দ্র থেকে স্বরচিত ও স্বকণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের উপস্থিতিতে এক মুশায়রায় সুললিত কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করলে মাশার্ল সাহেব অভিভূত হয়ে তাঁকে সবার সামনে বুকে জড়িয়ে নেন।
খানকা প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক অবদান
মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এমনকি ইলমে তাসাউফকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য তিনি ঢাকার বুকে একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে ৫৬, নন্দকুমার দত্ত রোডের ‘কাদেরী মঞ্জিলে’ খানকাটি প্রতিষ্ঠা করেন; পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে বকশীবাজার খানকা—ই—কাদেরিয়ায় স্থানান্তর করেন। তিনি সর্বদা যিকিরে ইলাহী ও হুব্বে মুস্তফা (সা.)—এ বিভোর থাকতেন। পাশাপাশি খানকায় আগত মেহমান ও ভক্তদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে ৫০০০ (পাঁচ হাজার) বার দরুদ শরীফ পাঠের অনুশীলন শুরু করেন; যা আজ অবধি সাঈদ আনোয়ার মোবারকি (মা.জি.আ.) চালু রেখেছেন। অসংখ্য গুণীজনের পদচারণায় মুখরিত ছিল এ খানকা। খানকার প্রতিটি কাজ ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়—শিষ্টাচারিতা, মেহমানদারিতা, সৌজন্যতা, ভদ্রতা, বিনয়ীতা, বদান্যতা। চন্দ্রমাসিক অনুষ্ঠান ও বিশেষ মাহফিলগুলোতে খতমে খাজেগান, ইসমে আজম, হামদ, দরুদ, ধর্মীয় আলোচনা, যিকির—আজকার, কবিতা আবৃত্তি, মরমী সংগীত, মিলাদ—কিয়াম, দোয়া—মুনাজাত ও তবারুক পরিবেশনের মাধ্যমে গভীর ভাবগাম্ভীর্যে আয়োজন হতো; যা আজও চালু আছে। এ মহৎ কাজ সমাধা করছেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী সাঈদ আনোয়ার মোবারকি (মা.জি.আ.)।
হযরত জহুরুল হক মোবারকি: ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক অবদান
হযরত জহুরুল হক মোবারকি (রহ.) ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী—ধ কবি, সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার, ভাষাবিদ, হাফেজে কুরআন, প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, শায়খুত তরীক্বত, সমাজসেবক এবং অসংখ্য দ্বীনি কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সহযোগী। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মানুষের অন্তর আলোকিত করা, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং নবীপ্রেমের প্রচারকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি ২ অক্টোবর ১৯৯৩ সালে ইহজগৎ ত্যাগ করে পরকালে পাড়ি দেন। তাঁর ইন্তেকালে অসংখ্য মানুষ শোক প্রকাশ করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু ও ফারসি বিভাগ, আজমীর শরীফ, দিল্লীর হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরবার, হযরত আলাউদ্দিন সাবের পিয়া (কালিয়া শরীফ) এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জ্ঞাপন করে।
খানকার আলোয় আগত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ:
সুফি জহুরুল হক মোবারকির নূরানী সান্নিধ্যে তৎকালীন সময়ে যারা এসে সমাজ, রাষ্ট্র, দরবার ও খানকায় আলোকিত বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাদের তালিকা: ড. আন্দালিব শাদানী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, উর্দু ও ফার্সী বিভাগের প্রধান), মুফতি দীন মোহাম্মদ (ইসলামি চিন্তাবিদ), বিচারপতি মাহবুব মোরশেদ, মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, জি.এ. মাদানী (ডি.আই.টি/রাজউক—এর তৎকালীন চেয়ারম্যান), নবাব খাজা হাসান আসকারী, কায়সার নাদভী (কবি ও সাংবাদিক), হযরত মাওলানা আবদুল গফুর (শান্তি নগরের পীর সাহেব), ভারতের প্রখ্যাত খানকার সাহেবজাদা, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, মাওলানা জামাল মিয়া ফারেঙ্গী মাহলী, ড. নওয়াজ (ইসলামি বিদ্বান), সৈয়দ ইকবাল আজিম (সাহিত্যিক ও কবি), আসিফ বানারাসী (সাহিত্যিক ও আলেম), মাওলানা সৈয়দ ওমর ফারুক, মাওলানা শফি ফারেঙ্গী মাহলী, মাওলানা আমিনুল এহসান মুজাদ্দেদি, তৎকালীন সেনা বাহিনীর প্রধান, হযরত শাফাক সাহেব, দরবেশ আহমেদ, হযরত সৈয়দ আহম্মদ উল্লাহ্, খানবাহাদুর ইয়াসিন খান, হযরত সাবের সাহেব, ইতিহাসবিদ ও লেখক হাকিম হাবিবুর রহমান, আজিমপুর বড় দায়রা শরীফ, আল্লামা কাশগরী (ঢাকা আলিয়া মাদরাসার প্রধান মুহাদ্দিস), প্রমুখ। হযরত জহুরুল হক মোবারকির জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি কেবল আধ্যাত্মিক শিক্ষার কেন্দ্র স্থাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা, সমাজসেবা ও নবীপ্রেমের এক অসাধারণ উদাহরণ।
হযরত জহুরুল হক থেকে সুফি সাঈদ আনোয়ার: আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার
বকশী বাজার খানকা প্রাচীনকাল থেকে আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মানবিকতা একসঙ্গে বিকাশ লাভ করে। খানকার প্রাচীন পীর সাহেব, প্রখ্যাত সুফি ও মরমি কবি সুফি জহুরুল হক মোবারকি, তাঁর জীবদ্দশায় আধ্যাত্মিক শিক্ষা, সাহিত্যিক চর্চা এবং সামাজিক সেবার মাধ্যমে খানকার ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করেছিলেন। তিনি তাঁর অনন্য কবিতা, সুফি ভাবধারা এবং মানবসেবার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জন্য আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান গদীনশীন সাঈদ আনোয়ার মোবারকি, তাঁর পিতার আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গ্রহণ করেছেন। তিনি নিয়মিত যিকির, দরুদ, মিলাদ, সাহিত্য আলোচনা এবং সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে খানকার নূরানী ঐতিহ্যকে যুগোপযোগী করে চলেছেন। মুরিদরা এখানে জিকির, সালাত, মুরাকাবা ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
পাশাপাশি কোরআন, হাদিস, তাসাউফ, ফিকহ ও আখলাক শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনও নিশ্চিত হয়। মুর্শিদের নির্দেশনা ও সোহবতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও তাজকিয়া সাধন হয়। খানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশে সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবাদত, আযকার, মজলিস ও খেদমতের নিয়মিত চর্চা মুরিদদের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করে। আদব, তাজিম, বিনয়, ভদ্রতা ও সৌজন্যতা প্রচলিত, যা মুরিদদের চরিত্রকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে। প্রতিদিনের যিকির, আযকার, দরুদ ও সালামের মাধ্যমে হৃদয় আধ্যাত্মিক আনন্দে পূর্ণ হয়। নীরব মুরাকাবা এবং আল্লাহর সত্তার প্রতি গভীর মনোযোগের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি ঘটে। খুতবা, ওয়াজ, মাওয়ায়েজ ও নসিহতের মাধ্যমে মুরিদদের আত্মশুদ্ধি সম্পন্ন হয়। দরিদ্র ও মুসাফিরদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য ও সেবা নিশ্চিত করা হয়।
কোরআন, হাদিস ও অন্যান্য ইসলামী গ্রন্থ সংরক্ষণ এবং আধ্যাত্মিক ইতিহাস প্রচারের মাধ্যমে অতীত থেকে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়। সামাজিক দিক থেকে, খানকার কার্যক্রম মানবিক ও সম্প্রদায়বোধের প্রতিফলন ঘটায়। খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা সহযোগিতা এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিয়মিতভাবে চলে। মুরিদরা একত্রে খতমে খাজেগান, দরুদ পাঠ, তরীকতের অজিফা, মীলাদ—ক্বিয়াম ও মুনাজাতে অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি আধ্যাত্মিক আসরে ঐতিহ্যমণ্ডিত খাবার বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়।
কোনো নজরানা বা হাদিয়ার প্রথা নেই; সাঈদ আনোয়ার মোবারকি নিজ ব্যবসার আয় থেকে সব খরচ বহন করেন। সকল মুরিদ পরস্পরের দুঃখ—দুর্দশায় সহযোগিতা করে, যার ফলে খানকা একটি বৃহত্তর পরিবারের মতো পরিচিত। খানকার প্রোগ্রামগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। প্রোগ্রামের সময় সকল মুরিদ চুপচাপ সারিবদ্ধভাবে বসে জিকিরে মগ্ন থাকেন; খাবার একসাথে দোয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় প্রান্তিক ও অপ্রান্তিক পীর—আউলিয়া, আলেম—ওলামা এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হন। মুনাজাত, কেরাত বা বয়ানের সময় পীর সাহেবের কণ্ঠ পরিবেশকে আধ্যাত্মিক আবেশে ভাসায়। প্রতিটি প্রোগ্রামে আহলে বায়তের স্মরণ ও তাদের জন্য দোয়া করা হয়।
গুণীজনদের সংবর্ধনা এবং স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়; এছাড়াও সাহিত্যিক ও অন্যান্য গুণীজন আসরে অংশগ্রহণ করেন। খানকা শুধু আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের কেন্দ্র নয়; এটি পুরান ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অঙ্গ। এখানে কবিতা আবৃত্তি, মরমী সঙ্গীত ও সুফি সাহিত্য আলোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষার বীজ বপণ হয়েছে। এটি শহরের সৃজনশীল পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছে।
খানকা একটি আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো, যেখানে আলেম, সাধক ও সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে ধর্মীয় জ্ঞান, সাহিত্যিক দক্ষতা এবং নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। নবীনরা শেখে জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা, যা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। মানবিক উদ্যোগ—দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম—সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা বাড়ায় এবং সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নবীন প্রজন্মের আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা। যিকির, মিলাদ, সাহিত্য আলোচনা এবং সমাজসেবা মাধ্যমে মানুষ শেখে কিভাবে নিজের জীবনকে আলোকিত ও অর্থপূর্ণ করা যায়। এইভাবে, বকশী বাজার খানকা কেবল আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, বরং ঢাকার পুরান শহরের জীবন্ত সমাজের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে, যেখানে ধর্ম, সাহিত্য ও মানবিকতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
সমাপনী
হাফেজ মাওলানা জহুরুল হক মোবারকি (রহ.) ছিলেন নবীপ্রেম ও খোদাপ্রেমের জীবন্ত নিদর্শন। তাঁর জীবন, সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সাধনা আজও আমাদের অন্তরকে আলোকিত করে, পথ দেখায় এবং মানুষের মনকে সিরাতুল মুস্তাকিমের দিকে চালিত করে। বকশী বাজার খানকা ও তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক জীবনের অমর স্মৃতি হয়ে আছে।