গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত
Advertisement
 
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম: অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাল দেশ''      পোর্ট লুইসে বাংলাদেশ হাইকমিশন বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি শোক বই উন্মুক্ত       আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার জানাজার খবর’’      ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার বাণী      খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন'      মায়ের জানাজায় যা বললেন তারেক রহমান      অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রীকে শেষ বিদায়'      
নতুন বছর, নতুন প্রত্যাশা: অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৫:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ২০৮)

নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা উল্টে যাওয়ার নাম নয়। এটি জাতির জন্য আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও পুনর্দিশা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। নতুন বছরের আগমনে আমরা নতুন স্বপ্ন দেখি, নতুন অঙ্গীকার করি—ভালোভাবে বাঁচার, মানবিক সমাজ গড়ার এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রত্যাশা কি কেবল আবেগঘন উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বাস্তব রূপ নেবে যুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সাহসী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে?নতুন বছরের প্রত্যাশা হওয়া উচিত আধুনিক ও প্রগতিশীল—অসম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন এবং মবসন্ত্রাসমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় অঙ্গীকার। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মানুষের মূল্যায়ন হবে তার যোগ্যতা, শ্রম ও মেধার ভিত্তিতে; পরিচয়, ক্ষমতা বা দলীয় আনুগত্যের জোরে নয়। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার শেষ আশ্রয় হিসেবে কাজ করবে।
গত বছরের বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়েছে—অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করেছে। ঘুষ-দুর্নীতি, অর্থপাচার, নারী নির্যাতন, শ্রমিক নিপীড়ন, গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যা, কিশোর গ্যাং, মব সহিংসতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট—নেতিবাচক ঘটনার তালিকা দীর্ঘ ও ভয়াবহ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া–ইউক্রেন ও ইসরায়েল–ফিলিস্তিন যুদ্ধের বৈশ্বিক অভিঘাত, যা আমাদের বাজার, কর্মসংস্থান, জ্বালানি ও জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বৈশ্বিক সংকটকে অজুহাত বানিয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতা আড়াল করার সুযোগ নেই। দেশের ভেতরের চিত্র আরও বেদনাদায়ক। বাজারে সিন্ডিকেটের শাসন কার্যত প্রতিষ্ঠিত। চাল, তেল, ডাল-পেঁয়াজ-রসুন—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে দিচ্ছে। রাষ্ট্রের দুর্বল বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে জনগণের পকেট ফাঁকা হচ্ছে, বাড়ছে দারিদ্র্য ও হতাশা। একই সঙ্গে বাড়ছে এনজিওনির্ভর ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতার সংখ্যা এবং উদ্বেগজনকভাবে আত্মহত্যার প্রবণতা। এটি নিছক অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি গভীর সামাজিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। একজন মানুষ ঋণের চাপে আত্মহননের পথ বেছে নিলে, সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে।
আজ চারদিকে যেন ঘোর অন্ধকার। ক্ষমতাবানদের একটি অংশ কার্যত আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে। কেউ কালোবাজারি, কেউ অর্থপাচারকারী, কেউ দখলদার, কেউ বন ও নদীখেকো, কেউ মাদক কারবারি, কেউ আইনের অপপ্রয়োগকারী। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অনিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেছে। ঘুষ সামাজিকভাবে স্বাভাবিকীকৃত। ‘স্পিড মানি’, ‘বকশিশ’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট’—নামে-বেনামে ঘুষ যেন সেবা পাওয়ার পূর্বশর্ত। হাসপাতাল থেকে লাশ ছাড় করাতেও স্বজনদের হয়রানি করতে হয়। এই বাস্তবতা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নির্মমভাবে প্রকাশ করছে।

নারী নির্যাতন একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গড়ে উঠেছে। নারী ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গনে—কোথাও নিরাপদ নয়। ধর্ষণ, নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় বিচারহীনতা অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। যে রাষ্ট্র তার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্র সভ্যতার দাবিতে অযোগ্য। তরুণ সমাজের বড় অংশ দিশাহীন হয়ে অপরাধ, মাদক ও সহিংসতার পথে ঝুঁকছে। কিশোর গ্যাং, মব সন্ত্রাস, ছিনতাই, অপহরণ, খুন, আত্মহত্যা—এসব অপরাধের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের গভীর সংকটের প্রতিফলন। সেবা খাতের অবস্থাও হতাশাজনক। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমি ও বিদ্যুৎ—মানুষের মৌলিক অধিকার—আজ বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়েছে। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর আর্তনাদ এবং চিকিৎসা বাণিজ্যের ফুলেফেঁপে ওঠা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রমাণ। শিক্ষার পরিমাণগত বিস্তার ঘটলেও গুণগত উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক শিষ্টাচারের বিকাশ আশানুরূপ হয়নি।

তবু এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও সম্ভাবনার আলো নিভে যায়নি। বাংলাদেশে সম্পদের অভাব নেই, নেই মেধা ও শ্রমশক্তির ঘাটতি। তবে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা সম্পদের সঠিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোব্যাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দেশের মোট জাতীয় বাজেটের দেড়গুণ। বছরে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, যা অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে। প্রথমে প্রয়োজন সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। দেশের বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, শিক্ষাবিদ ও জাতীয় নেতাদের নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপ সময়ের দাবি। চিহ্নিত ‘চুম্বক বিষয়গুলোতে’ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলেই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে এনে জনকল্যাণে ব্যয় করতে হবে। ঋণখেলাপি ও কালো টাকার মালিকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও স্বাধীন করতে হবে।
 শিক্ষায় কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। শিক্ষা এবং গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্ধ নিশ্চিত করার পাশপাশি তার বন্টন এবং ফলাফল মূল্যায়নের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার উন্নতির সাথে দেশের উন্নতি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। শিক্ষায় ১টাকা বিনিয়োগ করলে তার শতগুণ রির্টান পাওয়া যায়। তাই দেশ-জাতি ও শিক্ষার উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদেরও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের পিছনে রেখে শিক্ষার িএবং দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সংবিধান স্বীকৃত খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে। প্রশাসনিক ও বিচারিক দুর্বলতা দূর করতে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন, জনসচেতনতা ও জাতীয় ঐক্য। দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়—এই সত্যটি বাস্তব পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে।

বিজয়ের পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন করে শপথ নেওয়ার সময় এসেছে—মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অসম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার। রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে হবে, বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে। অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে হাঁটুক বাংলাদেশ—নতুন বছরে এটাই হোক আমাদের জাতীয় প্রত্যাশা। রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি সেবামূলক খাত—শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, পানি, ভূমি, যোগাযোগ—উন্নয়নমুখী ও নাগরিকবান্ধব করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, ঘুষ ও লুটপাটের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বার্ষিক বাজেট ও বরাদ্ধের ব্যবহার জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।
মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও নৈতিকতার চেতনা জাগ্রত করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আইনজীবী, প্রশাসক ও সামাজিক নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের শক্তি একযোগে প্রয়োগ করলে ঘুষ, দুর্নীতি ও অর্থপাচার প্রতিরোধ সম্ভব। নতুন বছর আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা, নতুন উদ্যোগ ও নতুন অঙ্গীকারের দ্বার উন্মোচন করছে। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা গর্বিত ও আশাবাদী। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক। সরকারের কার্যক্রম, জননিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ আরও শক্তিশালী হোক।
নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত—মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অসম্প্রদায়িক, দুর্নীতিমুক্ত এবং সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত বাংলাদেশ। দেশে বৈষম্য, নিপীড়ন, নারী নির্যাতন, কিশোর অপরাধ, ঘুষ, দুর্নীতি ও অর্থপাচার বন্ধ হোক। প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স নিরাপদ হোক, নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল হোক, শিক্ষাব্যবস্থা মানসম্মত হোক।নতুন বছর আমাদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলেছে। রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল, সাহসী এবং নাগরিকমুখী করে তোলাই হবে চূড়ান্ত অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচার বজায় রেখে অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথে হাঁটুক বাংলাদেশ- নতুন বছরে এটাই হোক আমাদের  জাতীয় প্রত্যাশা।









আরও খবর


সম্পাদক ও প্রকাশক : এ এইচ এম তারেক চৌধুরী
সহ-সম্পাদক: এম এ ওয়াহেদ- ০১৮৫৯-৫০৬৬১৪

প্রধান কার্যালয় : নাহার ম্যানশন ৫ম তলা, ১৫০ মতিঝিল বা/এ, ঢাকা -১০০০। নিউজ রুম: ০২৪৭১১০৪৫৪, ০১৮৮৬৩৩৩০৭৪।
e-mail: 71sangbad@gmail.com, web: 71sangbad.com