
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে, যাদের খেদমতে মানুষের আত্মিক জাগরণ অবিস্মরণীয়ভাবে ফুটে ওঠে। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খ্যাতিমান হাফেজ, মাওলানা ও পীরে কামেল, রাহনুমায়ে শরিয়ত, হাদিয়ে দ্বীন ও মিল্লাত অন্যতম। যার নামের রূহানি সুভাষ উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনপদের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। এ মহান খ্যাতিমান ওলীর নাম সৈয়দ নূর আহমদ (রহ.)। তিনি চট্টগ্রাম জনপদে ‘হাফেজ সৈয়দ নূর আহমদ শাহ’ এবং ‘হাফেজ সাহেব হুজুর’ নামে সমাদৃত ছিলেন।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে ভোরের আলোর মধুময় সময়ের এক শুভক্ষণে এ পৃথিবীতে নববী ধারার সুভাষিত নূরের ধারক ও বাহক হয়ে শুভাগমন করেন, হযরত সৈয়দ গোলাম রসূল (রহ.)—এর ঘরে। তাঁর মাতা ছিলেন মমতাময়ী ও পরহেযগার রমণী সৈয়দা আবেদা খাতুন (রহ.)। প্রকৃত অর্থে মানুষ দুটি কারণে সম্মানিত হয়; একটি বংশগত দিক দিয়ে, অন্যটি শিক্ষা—দীক্ষায়। আর এ মহান ওলী জন্মসূত্রে ছিলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.)—এর বংশধারার অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বাল্যকাল থেকেই অত্যন্ত শান্ত ও গাম্ভীর্য প্রকৃতির ছিলেন। বাল্যকালে পারিবারিক পরিবেশে এবং স্থানীয় মসজিদ—মক্তবে পড়াশোনা করে পবিত্র কুরআনুল কারিম হিফজ সম্পন্ন করেন। তাঁর কুরআন পাঠের সুমধুর তিলাওয়াতে পরিবেশ ও পশুপাখি পর্যন্ত শান্ত হয়ে যেত, এবং গ্রামের লোকজন বলত, ‘এ ছেলে একদিন বড় আলেম ও বুযুর্গ হবে’; তার সুরের ধ্বনিতে মনের মধ্যে প্রশান্তি অনুভূত হয়। পরবর্তীতে তিনি নববী জ্ঞান তথা কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানার্জন করেন বেশ কয়েকজন আলেমে দ্বীনের কাছ থেকে। তন্মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ৩ নং রায়পুর ইউনিয়নের ‘বড় মাওলানা’ খ্যাত মাওলানা আফাজ উদ্দীন শাহ (রহ.)— এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ হিসেবে তিনি ছিলেন, একজন হাফেজ এবং মাওলানা।
শরিয়ত তথা কিতাবি জ্ঞানার্জন শেষে ইলমে বেলায়াতের আলোতে আলোকিত হওয়ার উদ্দেশ্যে জনৈক বন্ধুর সঙ্গে ছুটে চলেন বারিয়া—হামেদিয়া সিলসিলার অন্যতম শক্তিধর আধ্যাত্মিক পুরুষ, চট্টগ্রামের হালিশহর মুনিরনগরের পীর সাহেবের কাছে; যিনি ‘সৈয়দ হাফেজ মুনিরুদ্দীন নুরুল্লাহ’ নামে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। প্রথম সাক্ষাতে হযরত নূর আহমদ (রহ.) যখন সৈয়দ হাফেজ মুনিরুদ্দীন (রহ.)—এর কাছে মুরিদ হওয়ার বিষয়ে কিছুটা সংকোচবোধ করেন, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই পীর সাহেব বলেন, “বাঁশখালী থেকে একজন মেহমান আসছেন, তাঁকে ডাকুন।”
স্বল্প আলাপের পর পীর সাহেব বলেন, “চোখ বন্ধ করুন।” দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ রাখার মধ্যে তিনি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত লাভ করেন। পীরের নির্দেশে চোখ খুলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে মুরিদ হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। এভাবেই তাঁর রূহানি পথচলার সূচনা হয়, এক নতুন দিগন্তের পথে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, হালিশহর দরবার শরীফে একটি ব্যতিক্রমধর্মী নিয়ম প্রচলিত ছিল, কর্মের মাধ্যমে আহার। হাফেজ মুনিরুদ্দীন নুরুল্লাহ (রহ.) প্রায়ই বলতেন, “বাবা! আমি গরিবের সন্তান। আমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আপনাদের ভরণপোষণের মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমার চাষের জমিতে কৃষিকাজ করে আপনারা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করবেন।” এই সূত্রে সেখানে যারা তরিকতের পথের পথিক হতেন, তারা পীর সাহেবের পৈতৃক জমিতে চাষাবাদসহ বিভিন্ন কাজ করে আহার সম্পন্ন করতেন।
তরিকতের পথে অগ্রসর হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো হালাল আহার। এ হিসেবে হযরত নূর আহমদ শাহ (রহ.) পীরের দরবারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি মেহমানদের জন্য খাবার রান্না করতেন। হাদিসে এসেছে, ইসলামের উত্তম কাজের অন্যতম হলো “মানুষকে খাবার খাওয়ানো।” নানাবিধ খেদমত ও রিয়াজতের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক আলোকিত মানুষ।
সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর বেলায়াতের জলওয়া ছড়িয়ে পড়ে হালিশহর দরবারের নূর—মহলে। একদা দয়াল ও দরদি পীর কেবলাজান সৈয়দ হাফেজ মুনিরুদ্দীন নুরুল্লাহ (রহ.) তাঁর স্নেহধন্য রূহানি সন্তান হযরত নূর আহমদ শাহ (রহ.)—কে সুমধুর কণ্ঠে ডেকে তরিকতের খেলাফতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। এ স্বীকৃতি কেবল মুখের কোনো বাক্য ছিল না; বরং আল্লাহর কুদরতি দপ্তরেই তাঁর নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।
তরিকতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বয় সাধন। তিনি প্রতি রাতের গভীর রজনীতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে আল্লাহর রহমতের ফয়েজ হাসিল করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় খেলাফত লাভের পর দ্বীনি খেদমতের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ান। বিশেষত চট্টগ্রাম মহানগর, বাঁশখালী, সন্দীপ, হাতিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে সশরীরে সফরের মাধ্যমে অসংখ্য আলোকিত মানুষ গড়ে তোলেন। তিনি আল্লাহর রহমত ও বরকতের নূরানী ধারায় তাঁদের আবৃত করে সিরাতুল মুস্তাকিমে দাখেল করেন। এভাবেই তাঁর বেলায়াতের ে¯্রাতধারা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম বাংলার পরতে পরতে।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত অল্পভাষী, অল্পাহারী ও সুমিষ্টভাষী। তাঁর কথা ও রূহানি দৃষ্টির প্রভাবে মানুষ সহজেই মোহিত হয়ে যেত। কারণ তাঁর চেহারা ও কথাবার্তায় এক ধরনের ঐশী নূর প্রতিফলিত হতো। এই নূরকেই নূরে মুহাম্মাদি বলা হয়। এখানে তাঁর নামের সার্থকতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে; নাম যেমন নূর আহমদ, তেমনি তিনি নূরে নবীর পবিত্র নূরসত্তা লাভে ধন্য হন।
এ মহান ইরফানি মানুষ কেবল পীর—মুরিদীর পরিসরে সীমাবদ্ধ না থেকে নববী জ্ঞানচর্চার মারকাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক খেদমত শুরু করেন। ১৯৬১ সালে তিনি নিজ গ্রামে ‘যাতানুরাইন ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলের একটি সুপ্রসিদ্ধ দ্বীনি মারকাজে পরিণত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি ‘বায়তুন নূর জামে মসজিদ’ও প্রতিষ্ঠা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর স্নেহের সন্তান শাহ সুফি সৈয়দ মুনিরুল ইসলাম (মা.জি.আ.) ‘মুনিরিয়া নূরীয়া হেফজখানা ও এতিমখানা’ প্রতিষ্ঠা করেন।
এ মহান ওলীর আধ্যাত্মিক জীবন পাঠে আমরা দেখতে পাই, তিনি অত্যন্ত কঠোর শরিয়তি শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন যাপন করতেন। তিনি মুরিদ সন্তানদের তালিম দেওয়ার সময় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, ফয়েজ ও তাওয়াজ্জুহ প্রদান করলে উপস্থিত সকলের মধ্যে আত্মিক জাগরণ সৃষ্টি হতো। তাঁরা আল্লাহ ও তার প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (দ.)—এর এশ্ক ও মুহাব্বতের দরিয়ায় নিমগ্ন হয়ে পড়তেন; এমনকি অনেকেই বেহুঁশ হয়ে যেতেন। এই প্রভাব সৃষ্টির কারণ হলো মানুষের ক্বলবে যখন আল্লাহর জিকির শুরু হয়, তখন রূহের উত্তান ও জাগরণ ঘটে।
লোহায় মরিচা পড়লে যেমন লালচে—বাদামি আস্তরণ জমে লোহার ওজন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি মানুষের অতিরিক্ত গুনাহ ক্বলবে কালো দাগ সৃষ্টি করে এবং মানুষ গোমরাহির পথে ধাবিত হয়; অর্থাৎ গুনাহের বোঝা বৃদ্ধি পায়। ক্বলবের এই দাগ দূর করার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত দৈনন্দিন ইবাদত, দরুদে মোস্তফা (দ.) পাঠ এবং বান্দার হক্ব সংশ্লিষ্টতা থাকলে যথাযথভাবে সে হক্ব আদায় করা। এতে মানুষের ক্বলব ধীরে ধীরে তার পূর্বের পবিত্র অবস্থায় ফিরে আসে। এই ক্বলবের মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর পরিচয় লাভ করে এবং আল্লাহ ও রাসূল (দ.)—এর বিধান পরিপালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য হাসিল করে।
এভাবেই হযরত নূর আহমদ শাহ (রহ.) তাঁর মুরিদ সন্তানদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তাসকিয়ার মাধ্যমে ইনসানে কামিল হিসেবে গড়ে তুলতেন। কাদেরিয়া সিলসিলার এ মহান ওলী আল্লাহ ১৯৮২ সালের ১ শাবান, রোজ মঙ্গলবার, দুনিয়াবি সফর শেষ করে আল্লাহর চূড়ান্ড সান্নিধ্যে গমন করেন। তাঁর ঐতিহাসিক জানাযা ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর মাজার শরীফ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব রায়ছটা গ্রামে ‘দরবারে নূরী’—তে অবস্থিত। তাঁর খেদমত আমাদের জন্য অনুস্মরণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে যুগ যুগান্তর।